পুবের কলম, মালদা: মালতীপুরে জনসভা শেষে মুখ্যমন্ত্রীর কপ্টার যখন গাজোলের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশে দেখা গেল এক রহস্যময় ড্রোন। হাই-প্রোফাইল ভিভিআইপি (VVIP) মুভমেন্টের সময় এই ধরনের ঘটনা রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের নিরাপত্তায় বড়সড় গাফিলতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। ক্লিয়ারেন্স জোনে কীভাবে এই ড্রোন এল, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতি ও পুলিশ প্রশাসনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।
মালদহের মালতীপুরে একটি পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে তৃণমূল নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গাজোলে যাওয়ার কথা ছিল। সেই অনুযায়ী তিনি নির্দিষ্ট হেলিপ্যাডে পৌঁছান। কিন্তু বিপত্তি ঘটে কপ্টার আকাশে ওড়ার ঠিক আগে। উপস্থিত পুলিশ আধিকারিক, নিরাপত্তারক্ষী এবং সাধারণ মানুষ সবিস্ময়ে দেখেন, মুখ্যমন্ত্রীর হেলিকপ্টারের উড়ান-পথের ঠিক সামনেই আকাশে একটি ড্রোন চক্কর কাটছে।
নিয়ম অনুযায়ী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের আকাশপথে যাতায়াতের সময় কঠোর নিরাপত্তা বলয় বা ‘ক্লিয়ারেন্স’ বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। ওই নির্দিষ্ট হাই সিকিউরিটি জোনে অন্য কোনও উড়ান বা ড্রোন ওড়ানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ থাকে। তা সত্ত্বেও, মুখ্যমন্ত্রীর কপ্টারের ক্লিয়ারেন্সের জায়গাতেই ওই ড্রোনটিকে উড়তে দেখা যায়। এর ফলে মুখ্যমন্ত্রীর হেলিকপ্টার ওড়াতে সরাসরি বাধা বা সমস্যা তৈরি হয়। মাটিতে দাঁড়িয়ে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ওই রহস্যময় ড্রোনটিকে আকাশে উড়তে দেখেন। সাধারণত মুখ্যমন্ত্রীর কপ্টার ওঠানামার ক্ষেত্রে জেলা পুলিশের পাশাপাশি স্পেশাল সিকিউরিটি ইউনিটের (SSU) কড়া নজরদারি থাকে। হেলিপ্যাডের আশেপাশের নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে নো-ফ্লাই জোন (No-Fly Zone) কার্যকর করা হয়। সেই বলয় ভেঙে কীভাবে একটি ড্রোন মুখ্যমন্ত্রীর এত কাছাকাছি চলে এল, তা নিরাপত্তার বড়সড় ফাঁকফোকর ছাড়া আর কিছুই নয়। ভিভিআইপিদের নিরাপত্তায় ব্লু-বুক (Blue Book) মেনে যে স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর (SOP) বা নির্দেশিকা পালন করার কথা, এক্ষেত্রে তার গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে বলে ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা। একটি ড্রোনের উপস্থিতি সামান্য ঘটনা মনে হলেও, ভিভিআইপি নিরাপত্তার নিরিখে এটি বড় ধরনের বিপদের কারণ হতে পারত বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।
এই অভাবনীয় ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই জনমানসে, রাজনৈতিক মহলে এবং সংবাদমাধ্যমে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর কপ্টার ওড়ার ঠিক আগে, ক্লিয়ারেন্সের জায়গায় কেন এবং কীভাবে আকাশে ড্রোন এল, তা নিয়ে বিস্তর জল্পনা শুরু হয়েছে। এত কড়া নিরাপত্তার মধ্যে এই ড্রোন কারা অপারেট করছিল এবং কোথা থেকে করছিল, তা এখনও অজানা। উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ এবং সংবাদমাধ্যমের তরফ থেকেও পুলিশের সার্বিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। যাঁরাই এই ড্রোন উড়িয়েছেন, অবিলম্বে তাঁদের চিহ্নিত করে (identify) উপযুক্ত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য জোরালো দাবি উঠেছে।
আরও পড়ুন:
ঘটনার পরেই নড়েচড়ে বসেছে মালদা জেলা প্রশাসন ও পুলিশ। হাইভোল্টেজ কর্মসূচির মাঝে মুখ্যমন্ত্রীর নিরাপত্তায় এহেন বিঘ্ন ঘটার বিষয়টি রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তাদেরও নজরে এসেছে। ইতিমধ্যেই ওই রহস্যময় ড্রোনের খোঁজে তল্লাশি এবং তার চালককে চিহ্নিত করতে পুলিশের তরফ থেকে ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়েছে। এটি নিছকই কোনও অতি-উৎসাহী সাধারণ মানুষের কাজ, নাকি এর পেছনে অন্য কোনও গভীর উদ্দেশ্য লুকিয়ে ছিল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছেন নিরাপত্তা আধিকারিকরা। রাজ্যের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্তার নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেই বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনকে আরও বেশি সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হেলিপ্যাডের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানোর পাশাপাশি, ড্রোন ওড়ানোর ক্ষেত্রে আরও কড়া নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।