পুবের কলম ওয়েব ডেস্কঃ কুরবানির ঈদের আগেই যত্রতত্র বা নিয়ম বহির্ভূতভাবে গবাদি পশু জবাই নিয়ে নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য সরকার। সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে। সেই সংক্রান্ত মামলার রায় স্থগিত রাখল কলকাতা হাইকোর্ট। তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র, রঘুনাথগঞ্জের তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামান থেকে শুরু করে সিপিএমের তরফে এই মামলাগুলি দায়ের করা হয় উচ্চ আদালতে। আজ বৃহস্পতিবার মামলার দীর্ঘ শুনানির পর রায় স্থগিত রাখে প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ডিভিশন বেঞ্চ। 

শুনানির সময় এদিন আদালতে তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র উপস্থিত ছিলেন । মহুয়া সহ অন্যান্য আবেদনকারীরা আদালতে যুক্তি দিয়েছেন, এই বিধিনিষেধ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। সমস্যার মুখে পড়বেন বহু দরিদ্র মানুষ। বিজেপি রাজ্যে সরকার গঠনের পরেই পশ্চিমবঙ্গ পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০ বলবৎ করে প্রকাশ্যে গবাদি পশু জবাই ও বিক্রিতে বেশ কিছু নিয়ম কার্যকর করেছে। বলা হয়েছে, যত্রতত্র বা নিয়ম বহির্ভূতভাবে পশু জবাই করা যাবে না। সংশ্লিষ্ট পশুর বয়স কমপক্ষে ১৪ বছর হতে হবে এবং সেটি স্থায়ীভাবে অক্ষম হতে হবে।  এছাড়াও এরজন্য অনুমতি নিতে হবে। সেই শংসাপত্রে স্থানীয় পুরসভা বা পঞ্চায়েতের প্রধানের পাশাপাশি একজন পশুচিকিৎসকের যৌথ স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক। এই অনুমতি ছাড়া কোনও পশুকে নির্দিষ্ট কসাইখানায় নিয়ে গিয়ে জবাই করা যাবে না। তা করলে দণ্ডনীয় অপরাধ বলেও উল্লেখ করা হয়।

স্বরাষ্ট্র দপ্তরের তরফে জারি করা বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, মূলত গরু, মহিষ, বলদ বা বাছুরের মতো গবাদি পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে একগুচ্ছ শর্ত আরোপ করা হয়েছে। 

মহুয়ার পক্ষে এদিন আদালতে সয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী শাদান ফারাসাত। তিনি এবিষয়ে আদালতের কাছে ছাড় চেয়েছেন। তিনি বলেন, ১৯৫০ সালের আইনটি ধর্মীয় ত্যাগের বিরুদ্ধে তৈরি করা হয়েছে। এই আইনে ধারা ৪-এ বলা হয়েছে কেবল ১৪ বছরের বেশি বয়সী পশুই কুরবানির জন্য জবাই করা যাবে। আইনজীবীর যুক্তি, ইসলামে উল্লেখ রয়েছে কুরবানির ঈদে শুধুমাত্র সুস্থ পশুকে জবাই করা যায়, কোনোভাবেই বৃদ্ধ বা পঙ্গু পশু জবাই করা যাবে না। তাই যেন ছাড় দেওয়া হয় সেই আর্জি আদালতের কাছে জানান আইনজীবী। তিনি আরও মনে করিয়ে দেন, আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র চাইলে যেকোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পশু জবাইকে ছাড় দিতে পারে।

আইনজীবী ডিভিশন বেঞ্চকে জানান, বকরিঈদে একটি বড় পশু ৭ জনের নামে এবং ছোট পশু ১ জনের নামে কুরবানি দেওয়া যায়। এপ্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, সর্বোচ্চ আদালত ধর্মীয় বাধ্যবাধকতার চেয়ে অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। তিনি জানান, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে গরুকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। যদিও তিনি বলেন, গরুর ক্ষেত্রে অন্যের অনুভূতিতে আঘাত লাগার বিষয়টি থাকতে পারে। কিন্তু মোষ, বলদ ও বলদের ক্ষেত্রে এমন কোনো বিষয় নেই ।  এদিন আদালত জানতে চায় পশু জবাই করা অপরাধ কিনা। উত্তরে আইনজীবী জানান, ৬ মাসের কারাদণ্ড ও জরিমানার কথা উল্লেখ রয়েছে বিজ্ঞপ্তিতে।

 

অন্যদিকে, আর এক আবেদনকারীর পক্ষে আদালতে সওয়াল করেন বরিষ্ঠ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এই আইনের উদ্দেশ্য হলো পশু জবাই নিয়ন্ত্রণ করা এবং কৃষিকাজের জন্য পশু সংরক্ষণ করা। তবে আইনটি প্রয়োগের অসুবিধা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন কৃষি আর মহিষ বা গরুর উপর নির্ভরশীল নয়। প্রযুক্তির উন্নতি হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই আইনটি শুধুমাত্র সেইসব পৌর এলাকায় কার্যকর যেগুলো ১৯৫২ সালে পুরসভা হিসবে ছিল। তার বাইরে এটা প্রযোজ্য ছিল না। কারণ এই আইন ১৯৫২ সালে কার্যকর হয়েছিল। তাঁর যুক্তি এই আইন কলকাতা পুরসভা এবং কালিম্পং ছাড়া অন্য কোথাও প্রযোজ্য নয়। 

তিনি আরও যুক্তি দেন, এই আইনের অধীনে পঞ্চায়েত সমিতিগুলির কথা বলা হয়নি। একইসঙ্গে পশুর বয়স সংক্রান্ত বিষয়ে বিকাশ রঞ্জন আদালতকে বলেন, আইনে বলা হয়েছে কোনো ব্যক্তি শংসাপত্র ছাড়া কোনো পশু জবাই করতে পারবে না। তাহলে জৈবিক পরীক্ষা ছাড়া কীভাবে একটি পশুর বয়স নির্ধারণ করা যায়! বিকাশের আরও যুক্তি,  আইন অনুযায়ী, শংসাপত্র প্রদান করতে অস্বীকার করলে সংশ্লিষ্ট আবেদনকারী ১৫ দিনের মধ্যে রাজ্য সরকারের কাছে আপিল করতে পারেন। প্রতিটি পশুর জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে ১ টাকা ফি দেওয়ার বিষয়টিকেও  অযৌক্তিক ও অবাস্তব বলে দাবি করেন তিনি। আইনজীবীর কথায়, আইন অনুযায়ী পুরসভাকে একটি কসাইখানা রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। তবে পশ্চিমবঙ্গে এমন কোনো কসাইখানা নেই।

তিনি আরও বলেন, এই আইনটি ধর্মীয়, চিকিৎসা সংক্রান্ত ইত্যাদি উদ্দেশ্যে প্রযোজ্য হবে না, যতক্ষণ না তা প্রতিবেশীদের ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বা আইনশৃঙ্খলার উপর প্রভাব ফেলে। বিকাশরঞ্জনের আরও যুক্তি,  আইনে একটি ব্যতিক্রম ছিল সেখানে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তিনি এই বিজ্ঞপ্তিকে পশু জবাইয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন। এর পাশাপাশি গবাদি পশু ব্যবসায়ীদের দুর্দশার কথাও তুলে ধরেন তিনি। বিকাশ ভট্টাচার্যের যুক্তি,  রাজ্য সরকার স্বাস্থ্যগত কারণে বিধিনিষেধ আরোপ করতে এবং বিক্রি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে তিনি অনুরোধ করেন যে সমস্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে এবং এলাকা নির্দিষ্ট করে এর অনুমতি দেওয়া হোক। 

এদিকে, কেন্দ্রের পক্ষে অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল অশোক চক্রবর্তী জানান,  কুরবানিতে পশু জবাই একটি ঐচ্ছিক ধর্মীয় প্রথা। এটি সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদের আওতাভুক্ত নয়। তিনি বলেছেন যে, আইনটির কোনো বিধান বাতিল হওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সুস্থ ও অসুস্থ গরুর মধ্যে কোনো পার্থক্য করা যাবে না। সীমান্তে বেড়া না থাকায় বিপুল সংখ্যক গরু বাংলাদেশে পাচার হচ্ছে। ফলে গরুর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। তিনি আরও জানান যে, লাইসেন্সপ্রাপ্ত কসাইখানা ছাড়া কোথাও পশু জবাই করা যাবে না। রাজ্য সরকারের পক্ষে আইনজীবী বলেন,  হাইকোর্টের নির্দেশ পালনের জন্যই বিজ্ঞপ্তিটি জারি করা হয়েছিল। এটি গোটা বাংলার জন্য প্রযোজ্য। সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত রায় স্থগিত রাখে।