প্রদীপ মজুমদারঃ একজন আমেরিকান চিকিৎসক সম্প্রতি ৫৭ বছরের এক ব্যক্তির শরীরে শূকরের হৃদযন্ত্র সফলভাবে প্রতিস্থাপন করে সারা বিশ্বে হইচই ফেলে দিয়েছেন। কিন্তু এই সাফল্য ২৫ বছর আগেই অর্জন করেছিলেন এক ভারতীয়– অসমের সন্তান। এর জন্য তাঁকে খ্যাতি নয় বরং হাজতবাস এনে দিয়েছিল। এমনকি তাঁকে 'পাগল চিকিৎসক' বলেও সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছিল। এই কাজের জন্য ট্রান্স প্ল্যান্টেশন অর্গান অ্যাক্ট ১৯৯৪ আইনের অধীনে তাঁকে গ্রেফতারও করা হয় ১৯৯৭ সালের ১০ জানুয়ারি।
আরও পড়ুন:
২৫ বছর আগে বিশ্বের প্রথম মানুষের শরীরে শূকরের হৃদযন্ত্রে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা সেই চিকিৎসকের নাম ডা. ধনীরাম বড়ুয়া। এই অসাধ্য সাধনে তাঁর সহকারী ছিলেন ডা. জোনাথান হো। তাঁরা এই সফল অঙ্গ প্রতিস্থাপনের কাজটি করেছিলেন ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি।
তিনি ব্রিটেনের রয়্যাল কলেজের কার্ডিয়াক সার্জেনদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। ব্রিটেনসহ বিশ্বের নানা দেশে হৃদযন্ত্রের অসংখ্য সফল অস্ত্রোপচার করেছেন ডা. ধনীরাম।আরও পড়ুন:
ডা. ধনীরাম বিদেশে যে সুবিধার মধ্যে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন– সেই উচ্চমানের সুযোগ সুবিধা তখন ভারতে ছিল না। তবুও ডা. ধনীরাম বরুয়া সমস্ত রকম সুযোগ সুবিধা ছেড়ে। ব্রিটেনের চাকরি ছেড়ে চলে আসেন দেশে। ফিরে যান নিজের রাজ্য অসমে। গুয়াহাটির কাছে সোনাপুরে গড়ে তোলেন নিজের রিসার্চ ইনস্টিটিউট। তাঁর মধ্যে অবাস্তবকে বাস্তবে পরিণত করার অদম্য বাসনা ছিল।
বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী গবেষণা ও সাফল্যের সেই বাসনা। এমনকি তাঁর বন্ধুদের কাছ থেকে শোনা যায়– একজন অসমবাসী হিসেবে এবং একজন ভারতীয় চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার আন্তরিক প্রত্যাশী ছিলেন ডা. ধনীরাম বড়ুয়া। সেসব কারণেই হয়তো লোকে তাকে 'পাগল চিকিৎসক' বলতেন।আরও পড়ুন:
ডা. ধনীরাম বড়ুয়া ১৯৯৬ সালে তাঁর গবেষণার সফল প্রয়োগের জন্য বেছে নিয়েছিলেন হৃদজনিত সমস্যায় আক্রান্ত– ভেনট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্টে আক্রান্ত ভেনট্রিকুলার সেপটাল ডিফেক্টে আক্রান্ত ৩২ বছরের পূর্ণ শইকিয়াকে। তাঁর হৃদযন্ত্র বদলে বেছে নিয়েছিলেন শূকরের হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করার জন্য। ১৯৯৭-এর ১ জানুয়ারি পূর্ণ শইকিয়ার শরীরে শূকরের হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপনের আগে ডা. ধনীরাম বড়ুয়া এবং তাঁর হংকং-এর সহকর্মী ডা. জেনাথন হো এই অস্ত্রোপচার সংক্রান্ত সমস্ত প্রস্তুতি নিখুঁতভাবে ফেরে ফেলেন।
আরও পড়ুন:
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে রোগীর শরীরে হাইপার অ্যাকুরিটি রিজেকশন দেখা দেওয়ায় মৃত্যু হয়। যেহেতু এই অস্ত্রোপচারের পর এক সপ্তাহ ধরে রোগী বেঁচে ছিলেন– তাতে এটাই প্রমাণ করে ধনীরাম সঠিক পথে এগিয়েই সাফল্যের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
কিন্তু রোগী শইকিয়ার মৃত্যুতে দেখা দেয় তুমুল বিতর্ক। ডা. ধনীরাম ও ডা. জেনাথন হো-কে ১৯৯৭ সালের ১০ জানুয়ারি গ্রেফতার করা হয়। তাঁদের ৪০ দিন হাজতবাস করতে হয়। তৎকালীন অসম সরকার এই অস্ত্রোপচার নিয়ে একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছিল। তদন্তে রায় হয়– মানুষের শরীরে এইভাবে শূকরের হৃদযন্ত্র প্রতিস্থাপন করার বিষয়টি বেআইনি এবং অনৈতিক। সেই সময় ধনীরামের গবেষণা গারটিও কেউ বা কারা জ্বালিয়ে দিয়েছিল। একই সঙ্গে ডা. ধনীরামকে পড়তে হয় সামাজিক বয়কটের মুখে। লোকে তাকে 'শূকরের ডাক্তার' বলেও কটাক্ষ করতে থাকে। এমন সামাজিক বয়কটের মুখে গত ২০১৭ সালে ব্রেন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন যুগান্তকারী গবেষণার এই সফল চিকিৎসক। তাঁর কথায় এখন জড়তা– স্মৃতিশক্তি লোপ। কেবল প্রাণে বেঁচে আছেন।