গোলাম রাশিদঃ একজন মেধাবী সম্পাদক। মননশীল প্রাবন্ধিক। তার চেয়েও বড় পরিচয়, তিনি একজন বড় মাপের মানুষ। কেউ তাঁর কাছে শিখেছেন পত্রিকা সম্পাদনা। কেউ-বা সাংস্কৃতিক জগতের সঙ্গী। কেউ তাঁকে দেখেছেন সহকর্মী হিসেবে। কেউ-বা দেখেছেন দূর থেকে, মুগ্ধ পাঠক হিসেবে। মরহুম আবদুর রাউফের স্মরণসভায় উঠে এল এমনই সব স্মৃতির কথা, সখ্যের কথা। রবিবার সারাদিনই ছিল বৃষ্টির ভ্রুকুটি। সেসব উপেক্ষা করেই গুণমুগ্ধ বিশিষ্টজনেরা হাজির হয়েছিলেন মধ্য কলকাতার রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের উর্দু অ্যাকাডেমিতে।

সম্পাদক, লেখকের বাইরেও তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের মানুষ স্মরণসভায় সহধর্মিণী মুসতাবসেরা রাউফ ও শিক্ষাবিদ মীরাতুন নাহার

আবদুর রাউফ (২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৭ - ৯ জুন, ২০২২) গত ৯ জুন পার্ক সার্কাসে ইন্তেকাল করেন। তার আগে প্রায় দু-মাস শয্যাশায়ী ছিলেন। ভুগছিলেন ক্যান্সারে। তাঁর চলে যাওয়া বাংলার সাংস্কৃতিক জগতের কাছে এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি ছিলেন বাঙালি মুসলমানদের এক প্রতিনিধি-স্থানীয় ব্যক্তিত্ব।

সম্পাদক, লেখকের বাইরেও তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের মানুষ

তাঁর তীক্ষ্ণ শানিত মেধা ফুটে উঠেছে নানা আলোচনায়, নিবন্ধে। দীর্ঘ ২৬ বছর হুমায়ুন কবীর ও আতাউর রহমান প্রতিষ্ঠিত ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন আবদুর রাউফ। এই সময়কালে তিনি পত্রিকাটিকে দুই বাংলার শক্তিশালী লেখকদের মাধ্যমে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছিলেন।

সম্পাদক, লেখকের বাইরেও তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের মানুষ

তাঁকে নিয়ে এই স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিনী মুসতাব সেরা রাউফ, লেখিকা মীরাতুন নাহার, পুবের কলম পত্রিকার সম্পাদক ও প্রাক্তন সাংসদ আহমদ হাসান ইমরান, অধ্যাপক আমজাদ হোসেন, প্রাক্তন সাংসদ ও লেখক মইনুল হাসান, লেখক প্রাণতোষ বন্দোপাধ্যায়, অধ্যাপক মীর রেজাউল করিম, আল আমীন বার্তার নির্বাহী সম্পাদক শেখ হাফিজুর রহমান, আবদুল মাতিন, তথ্যচিত্র নির্মাতা মুজিবর রহমান, সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক সাইফুল্লা, অভিজিৎ কর গুপ্ত, একরামুল হক শেখ, কাজী গোলাম গউস সিদ্দিকি, আসাদ রউফ, ‘চতুরঙ্গ’ গবেষক কস্তুরী, সমাজকর্মী সানাউল্লাহ খান, অবসরপ্রাপ্ত আধিকারিক লিয়াকত আলি, সরকারি আধিকারিক ইনাসউদ্দিন, সাংবাদিক জাইদুল হক, জয়নাল আবেদিন প্রমুখ।

সম্পাদক, লেখকের বাইরেও তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের মানুষ

সবাই আবদুর রাউফকে নিয়ে তাঁদের স্মৃতিরোমন্থন করেন। পুত্র অধ্যাপক আসাদ রউফ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ‘আমার বাবা একজন শক্তিশালী যুক্তিবাদী মানুষ ছিলেন। তিনি বলতেন, তুমি নিশ্চিতভাবে কিছুই জানো না। নম্র হও। প্রায়শই ভবিষ্যতে বুঝতে পারবে অতীতে তুমি ভুল ছিলে। ইসলামের শিক্ষায় তিনি শান্তি পেয়েছিলেন। তিনি বছরের পর বছর ধরে কুরআন শরীফের শিক্ষা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেন এবং আক্ষরিক অর্থের বাইরে গভীর অর্থ খুঁজে পান।

ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে সত্য বলা তিনি কর্তব্য বলে মনে করতেন। এসবের পাশাপাশি সারা জীবন একজন অসামান্য বাবার ভুমিকা পালন করেছেন তিনি।’ আবদুর রাউফের সম্পাদনায় ‘চতুরঙ্গ’ কীভাবে উঁচুদরের পত্রিকাতে পরিণত হয়েছিল, সে-কথা উঠে আসে প্রাক্তন সাংসদ মইনুল হাসানের স্মৃতিচারণায়। ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকা ও আবদুর রাউফের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন তিনি।

অধ্যাপক আমজাদ হোসেন বলেন,‘তিনি যে গুরুগম্ভীর মানুষ ছিলেন তা নয়, তাঁর সেন্স অফ হিউমার ছিল অসাধারণ।’ আবদুর রাউফের মৃত্যুর খবর পুবের কলম ছাড়া অন্য কোনও মূলধারার দৈনিক সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়নি। সাব-অলটার্ন সমাজের এত বড় মাপের মানুষকে নিয়ে বৃহত্তর সমাজে এতটা উদাসীনতা কেন, এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল মাতিন। সম্পাদক, লেখকের বাইরেও আবদুর রাউফ ছিলেন একজন বড় মাপের মানুষ। এভাবেই তাঁকে মূল্যায়ন করেন প্রাক্তন আইএএস লিয়াকত আলি।

‘পুবের কলম’ সম্পাদক আহমদ হাসান ইমরান তাঁর সঙ্গে আবদুর রাউফের দীর্ঘদিনের পরিচয়ের কথা তুলে ধরেন। কমিউনিস্ট আবদুর রাউফ কীভাবে ইসলাম-বিশ্বাসী আবদুর রাউফে পরিণত হলেন, তার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আবদুর রাউফ প্রথম দিকে এসইউসিআইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেই সময় ইসলামি বিষয়ে পড়াশোনার জন্য স্কলার মরিয়ম জামিলা, খুরশিদ আহমেদ প্রমুখ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী আলেম ও চিন্তাবিদদের বই দিতে আরম্ভ করি। বইগুলি তাঁকে প্রভাবিত করেছিল।

সম্পাদক, লেখকের বাইরেও তিনি ছিলেন একজন বড় মাপের মানুষ

সামগ্রিকভাবে ইসলাম ও মুসলিম সমাজকে বুঝতে চাইতেন। তিনি ভাবতেন, কেন এপার বাংলায় থেকে যাওয়া মেধাবী মুসলমানরা সমাজে স্বীকৃতি পাচ্ছে না।’ তাঁর সহযোগিতায় মুসলিম রেনেসাঁ সোসাইটি গড়ে তোলার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ‘মুসলমানদের নিয়ে হিন্দু সমাজের ভুল ধারণা যাতে দূর হয়, তার চেষ্টা করতেন আবদুর রাউফ।

‘সংবাদ প্রতিদিন’-এ নিয়মিত কলামে মজলুম মানুষদের কথা তুলে ধরতেন।’ অধ্যাপিকা মীরাতুন নাহার এদিন আবদুর রাউফ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বাংলার মুসলমানদের ‘মানসিক সংকট’-এর কথা তুলে ধরেন।

হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় পরিচয়ের বাইরে গিয়ে বাঙালি আবদুর রাউফকে তিনি চিনতেন।

তাঁর বক্তৃতায় উঠে আসে ‘কাফেলা’ সম্পাদক আবদুল আযীয আল আমানের কথা। তিনি দাড়ি-টুপি পরিহিত ছিলেন না প্রথমদিকে। পরে কঠোর ধর্মাচরণ শুরু করেন। তবে তাঁর হরফ প্রকাশনা থেকে গীতা-উপনিষদের পাশাপাশি কুরআন-হাদিসের বইও প্রকাশিত হয়েছে। আবদুর রাউফও ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। কিন্তু তিনিও পরবর্তীতে ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে নিজেকে দেখেছেন।

বাঙালি তথা ভারতীয় মুসলমানদের প্রত্যেকেই এমন পরিচিতি সংকটে ভুগছে বলে জানান মীরাতুন নাহার। প্রাণতোষ বন্দোপাধ্যায় বলেন, ‘আবদুর রাউফ বলতেন, ইসলামের ভালো দিকগুলো আলোচনা করুন। জ্ঞানে ও মননে অনেক বড় মাপের মানুষ ছিলেন তিনি।’ নাট্যকার অভিজিৎ কর গুপ্ত বলেন, ‘মাও সে তুং বলতেন, সত্য মাঝে মাঝে একদম একা হয়ে যায়। আবদুর রাউফ ছিলেন এমনটাই। অত মুক্ত মনের মানুষ কম দেখেছি।’

এ দিনের সভায় প্রস্তাব রাখা হয় প্রতি বছর ফেব্রুয়ারি মাসে আবদুর রাউফকে নিয়ে স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হবে। তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত হবে স্মারকগ্রন্থও, আলিয়া সংস্কৃতি সংসদের পক্ষ থেকে এমনটাই জানান অধ্যাপক সাইফুল্লা। উর্দু অ্যাকাডেমির অডিটোরিয়ামে এদিনের সভাটির আয়োজক ছিল আলিয়া সংস্কৃতি সংসদ, ওরিয়েন্টাল মিডিয়া ফোরাম ও আল আমীন মিশন।