চোরবাগান পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হল পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টুকে। বৃহস্পতিবার নদিয়ার কল্যাণী থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্তকারীদের দাবি, মণ্ডপে ভিড়ের মধ্যে ‘মণ্ডপ ভেঙে পড়ছে, আপনারা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যান’—এমন ঘোষণা ঘিরেই আতঙ্ক আরও ছড়িয়ে পড়েছিল। কার নির্দেশে ওই ঘোষণা করা হয়েছিল, তা জানতে সঞ্জীবকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন তদন্তকারীরা। এই ঘটনায় অভিযুক্ত অন্য এক ঘোষকের এখনও খোঁজ মেলেনি।

চোরবাগান বিপর্যয়ে কী কারণে এবং কার গাফিলতিতে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, তা জানতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল বা সিটের পাশাপাশি ডিসি শৈলজা দাসের নেতৃত্বে লালবাজারের আরও একটি তদন্তকারী দল ঘটনার অনুসন্ধান করছে। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে সিসিটিভি ফুটেজ।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ফুটেজে মণ্ডপের বাইরে বেরোনোর গেটে প্রবল ঠেলাঠেলি এবং বিশৃঙ্খলার ছবি ধরা পড়েছে। আতঙ্কিত দর্শনার্থীদের চিৎকার, মাটিতে পড়ে থাকা বহু মানুষের দৃশ্যও দেখা গিয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মণ্ডপ ভেঙে পড়ার ঘোষণা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। পুলিশের অনুমান, ওই ঘোষণায় আতঙ্ক আরও বেড়ে যাওয়ায় ভিড় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।

তদন্তে উঠে এসেছে, মণ্ডপের বাইরে বেরোনোর রাস্তার কাছে পুজো কমিটির কর্মকর্তা ও অতিথিদের বসার ব্যবস্থা ছিল। সেখান থেকেই ওই ঘোষণা করা হয় বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের। হেফাজতে থাকা অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, ঘোষণার দায়িত্বে ছিলেন পুজো কমিটির কোষাধ্যক্ষ সঞ্জীব রাহা ও তাঁর এক সহযোগী।

এরপর দু’জনের বাড়িতে তল্লাশি চালায় পুলিশ।

কিন্তু তাঁদের কাউকেই পাওয়া যায়নি। দু’জনের মোবাইল ফোনও বন্ধ ছিল। তদন্তকারীরা তাঁদের আত্মীয়দের ফোনের সূত্র ধরে খোঁজ চালাচ্ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে সঞ্জীব বাড়িতে ফোন করলে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে সূত্র পায় পুলিশ। সেই সূত্র ধরে কল্যাণীতে পৌঁছে তাঁকে আটক করা হয় এবং পরে কলকাতায় নিয়ে আসা হয়।

এদিকে, নিহতদের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিভিন্ন জেলায় নিহতদের বাড়িতে গিয়ে পরিজনদের হাতে ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দিচ্ছেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীও ভিড় নিয়ন্ত্রণে গাফিলতি এবং অবিবেচনাপ্রসূত ঘোষণাকে বিপর্যয়ের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তবে এত বড় ঘটনার পর পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। পুলিশ সূত্রের দাবি, পুজোর আগে মণ্ডপের যৌথ পরিদর্শনে লালবাজারের আধিকারিকদের সঙ্গে দমকল ও সিইএসসির প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। ওই পরিদর্শনে মণ্ডপে প্রবেশ ও বেরোনোর রাস্তা অত্যন্ত সরু এবং একই পথে প্রবেশ ও বেরোনোর ব্যবস্থা থাকার বিষয়টি উঠে এসেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ, প্রায় ২৫ ফুট চওড়া বেরোনোর রাস্তার ১৫ ফুট জুড়ে ছিল খাবারের দোকান। পুজো কমিটিকে এই সমস্যাগুলি জানানো হলেও তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ।

এখন প্রশ্ন উঠছে, নিয়ম না মানার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় থানার তরফে পুজো কমিটির বিরুদ্ধে কোনও সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছিল কি না। যৌথ পরিদর্শনের পর ত্রুটিগুলি উল্লেখ করে নোটশিট তৈরি হয়েছিল কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। সঞ্জীব রাহাকে জেরা করে ঘোষণার নেপথ্যে কারা ছিলেন এবং বিপর্যয়ের আগে কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়ার চেষ্টা চলছে।