উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : ঘাড়ে পিঠে বাঘের থাবার দাগ এখন ও স্পষ্ট। কয়েক বছর আগের সেই ভয়াবহ দিনের স্মৃতিও আজও টাটকা। সুযোগ থাকলে হয়তো জীবনে আর জঙ্গলের পথ মাড়াতেন না তাঁরা। কিন্তু গ্রামে কাজের সুযোগ সীমিত। পেটের টানেই তাই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে মাছ, কাঁকড়া ধরতে সুন্দরবনের জঙ্গলে ফিরতে হয় বহু গ্রামবাসীকে। এবার সেই জঙ্গলমুখী নির্ভরতা কমাতে বিকল্প কর্মসংস্থানের নতুন উদ্যোগ শুরু হয়েছে সুন্দরবনে। নাম— ‘বাদাবনের জলবায়ু সহনশীল সমন্বিত মৎস্যচাষ মডেল’।ভারতের অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চল সুন্দরবনে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, নদীবাঁধের ক্ষয় এবং কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ায় প্রান্তিক মানুষের জীবিকা ক্রমশ ঝুঁকির মুখে।
এই পরিস্থিতিতে বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে সক্রিয় হয়েছে পরিবেশ ও বন্যপ্রাণপ্রেমী সংগঠন ‘নেচার এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সোসাইটি’ (নিউজ)। সহযোগিতায় রয়েছে এসবিআই ফাউন্ডেশন। ‘এসবিআইএফ লিপ ক্লাইমেট স্মার্ট লাইভলিহুডস’ প্রকল্পের মাধ্যমে সুন্দরবনের বিভিন্ন গ্রামে জলবায়ু সহনশীল জীবিকাভিত্তিক একাধিক কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।‘নিউজ’-এর কর্ণধার অজন্তা দে জানান, ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামীণ পরিবারগুলির জন্য সুস্থিত ও বহুমুখী জীবিকার সুযোগ তৈরি করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘ইন্টিগ্রেটেড ম্যানগ্রোভ অ্যাকুয়াকালচার’ (আইএমএ)। পাশাপাশি গ্রামের পুকুরে মিষ্টি জলের মাছচাষ,হাঁস প্রতিপালন, মৌমাছি পালন, মাশরুম চাষ এবং গ্রামীণ উদ্যোগের উন্নয়নেও জোর দেওয়া হচ্ছে।বাদাবন সমন্বিত মৎস্যচাষ মডেলের পরীক্ষা মূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছিল ২০২০ সালে, সুন্দরবনের মিনাখাঁ ও কুলতলি ব্লকের কয়েকটি নির্বাচিত গ্রামে। স্থানীয় পরিবেশ ও মৎস্যচাষ ব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ধীরে ধীরে এটি একটি জনগোষ্ঠী ভিত্তিক জলবায়ু সহনশীল চিংড়ি চাষ পদ্ধতিতে পরিণত হয়। প্রাথমিক সাফল্যের পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ফাও-এর কাছ থেকে ‘গ্লোবাল টেকনিক্যাল রেকগনিশন’ স্বীকৃতিও মেলে বলে আয়োজকদের দাবি।এবার সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে মিনাখাঁ ব্লকের ফুলবাড়ি গ্রামের প্রায় ৬.৪৮ হেক্টর নোনা জলের পুকুরে আরও ১০ জন উৎপাদককে যুক্ত করে প্রকল্পটি সম্প্রসারিত করা হয়েছে।প্রথম ধাপে কর্মসূচিটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে।পাশাপাশি আইএমএ পদ্ধতি নিয়ে সচেতনতা ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের আওতায় প্রায় ২০০ জন মৎস্যচাষিকে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।এই পদ্ধতিতে একই জলাশয়ে ম্যানগ্রোভ রোপণ এবং লবণাক্ত জলের মাছ ও চিংড়ি চাষকে সমন্বিত করা হয়। পুকুরের বাঁধে ম্যানগ্রোভ গাছ লাগানোর পাশাপাশি জলাশয়ে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মূলত বাগদা চিংড়ি ও বিভিন্ন মাছ চাষ করা হয়। রাসায়নিকের উপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিক উপায়ে জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।চাষিদের পুকুর প্রস্তুতি, জলের গুণমান নিয়ন্ত্রণ, সঠিক পদ্ধতিতে পোনা মজুত, খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈজ্ঞানিক আহরণ পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। রোগের প্রকোপ কমিয়ে কীভাবে জলাশয়ের পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রাখা যায়, সেদিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন লবণাক্ততা-সহনশীল প্রজাতিকে একসঙ্গে চাষের মাধ্যমে একক চাষের ঝুঁকি কমিয়ে উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে।এই মডেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল জলাশয়ের বাঁধে ম্যানগ্রোভ রোপণ। ম্যানগ্রোভ বাঁধকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি ভূমিক্ষয় রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক সুরক্ষা গড়ে তুলতে সাহায্য করে।শুধু উৎপাদন বা পরিবেশ সংরক্ষণ নয়, উৎপাদিত মাছ ও চিংড়ির বাজার-সংযোগের উপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘বাদাবন ফার্মারস প্রডিউসর কোম্পানি লিমিটেড’-এর মাধ্যমে উৎপাদকদের সংগঠিত বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদিত পণ্য ‘বাদাবন হার্ভেস্ট’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে বাজারজাত করার পরিকল্পনা ও রয়েছে।প্রকল্প উদ্যোক্তাদের আশা, এই মডেল সুন্দরবনে জীবিকা ও পরিবেশ সংরক্ষণকে একই সুতোয় বাঁধতে পারবে। স্থানীয় জলাশয়েই যদি স্থায়ী আয়ের সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে জীবিকার তাগিদে মৎস্যজীবী দের বারবার গভীর জঙ্গলে ঢোকার প্রয়োজন কমবে। ফলে একদিকে যেমন বাঘের সঙ্গে মানুষের সংঘাতের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে, অন্যদিকে সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাস্তুতন্ত্রও আরও সুরক্ষিত হবে। বিকল্প কর্মসংস্থানের এই উদ্যোগ সফল হলে সুন্দরবনের জীবিকা ও পরিবেশ সংরক্ষণে তা নতুন দিশা দেখাতে পারে।