নেপালে ভয়াবহ হড়পা বানের পর একশো ঘণ্টারও বেশি সময় পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ। সময় যত গড়াচ্ছে, তাঁদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও তত ক্ষীণ হচ্ছে। বিপর্যস্ত এলাকাগুলিতে একের পর এক দেহ উদ্ধার হচ্ছে। রবিবার বিকেল পর্যন্ত নেপালে মোট ৭৮১ জনের দেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গিয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ২,৫০২ জন। জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ৯,৪৩৫ জনকে। তিব্বতেও ১৬ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৪৬ জন। রেড ক্রসের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই বিপর্যয়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

এই বিপর্যয়ে নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন বহু ভারতীয়। শনিবার রাতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছিল, ১০৮ জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও ৫০ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। তখনও ২৭৫ জন ভারতীয় নিখোঁজ ছিলেন। রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত উদ্ধার হওয়া ভারতীয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৯। নেপালি কর্তৃপক্ষও জানিয়েছে, রবিবার আরও সাত জন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে।

অন্য দিকে, চিন থেকে রবিবার ৪০৩ জন ভারতীয় নেপালে ফিরেছেন। চিনে এখনও প্রায় ৫০০ ভারতীয় রয়েছেন এবং তাঁরা নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছে বিদেশ মন্ত্রক।

এর মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের ৩৭ জন বাসিন্দাকে নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত। নেপালে প্রথমে রাজ্যের ৩৯ জনের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। পরে বসিরহাটের এক দম্পতির সন্ধান মেলে এবং তাঁরা রাজ্যে ফিরে এসেছেন। রবিবার রাতে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, এখনও ৩৭ জনের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাঁদের সন্ধানে রাজ্যের পক্ষ থেকে যোগাযোগ ও উদ্ধার তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

বিপর্যয়ের পর নিখোঁজদের পরিবারের সদস্যেরা মর্গগুলিতে ভিড় করছেন। কিন্তু অধিকাংশ দেহের এতটাই পচন ধরেছে যে মুখ দেখে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে কারও স্কুলের টাই, কারও গয়না, কারও পোশাক কিংবা শরীরে থাকা ট্যাটুর মতো চিহ্ন দেখে পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। যেসব দেহ শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না, সেগুলির ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট স্থানে গণকবর দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেপাল প্রশাসন।

রাসুয়ার বিপর্যস্ত এলাকা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে চিতওয়ান জেলার দেবঘাট জঙ্গলে অশনাক্ত দেহগুলির সমাধির ব্যবস্থা করা হয়েছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ইতিমধ্যে শয়ে শয়ে কবর খোঁড়া হয়েছে। প্রতিটি দেহের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পাশাপাশি তার সঙ্গে থাকা গয়না, পোশাক, নগদ টাকা বা অন্যান্য শনাক্তযোগ্য সামগ্রী নথিভুক্ত করা হচ্ছে।

প্রতিটি দেহকে একটি স্থায়ী শনাক্তকরণ নম্বরও দেওয়া হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনও পরিবার নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান করলে সংগৃহীত তথ্য ও ডিএনএ নমুনার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।

নেপালের প্রশাসন জানিয়েছে, দেহ কবর দেওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সব ধরনের শনাক্তকরণ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কবরের অবস্থান নথিভুক্ত করা হচ্ছে এবং মাটির উপরে ও নীচে চিহ্ন রাখা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে পরিচয় নিশ্চিত হলে যাতে দেহাবশেষ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সেই লক্ষ্যেই এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে। ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণে নেপালি কর্তৃপক্ষকে সহায়তা করতে ভারত থেকেও একটি ফরেনসিক দল পাঠানো হয়েছে।

বিপর্যয়ের ভয়াবহতায় নেপালের হাসপাতালগুলির মর্গগুলিও কার্যত উপচে পড়েছে। যেখানে সাধারণত ৩০ থেকে ৫০টি দেহ সংরক্ষণ করা যায়, সেখানে কোনও কোনও হাসপাতালে ২০০ থেকে ৩০০টি দেহ এসে পৌঁছেছে। ভরতপুর হাসপাতালে মূল মর্গের পাশাপাশি অস্থায়ী মর্গ তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু সেখানেও জায়গার অভাব দেখা দিয়েছে। মেঝেতেও সারি দিয়ে দেহ রাখা হয়েছে। দীর্ঘ সময় বানের জলে পড়ে থাকার কারণে বহু দেহে পচন ধরেছে। ফলে দুর্গন্ধের মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী এবং রেড ক্রসের কর্মীদের।

অন্য দিকে, নেপালের ত্রিশূলী নদীর তীরে থাকা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলিতেও ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে। রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলায় নদীটির উপর মোট ন’টি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে, যার মধ্যে পাঁচটি এখনও নির্মীয়মাণ।

হড়পা বানের জেরে প্রকল্পগুলির সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ কাদা ও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে যায়। প্রায় ৯০০ শ্রমিক বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করছিলেন বলে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে সাড়ে তিনশোর কিছু বেশি শ্রমিককে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও অন্তত ৫৩৭ জনের এখনও কোনও সন্ধান মেলেনি।

সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে নেপাল সেনা ও উদ্ধারকারী দলগুলিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে। কোথাও কোথাও এত বিপুল পরিমাণ কাদা ও ধ্বংসস্তূপ জমেছে যে থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করেও ভিতরে আটকে থাকা মানুষের অবস্থান শনাক্ত করা যাচ্ছে না। নুয়াকোটের আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের সুড়ঙ্গের প্রবেশপথও পুরোপুরি চাপা পড়েছিল। রবিবার বিকেলে ড্রিল মেশিন, মাটি কাটার যন্ত্র ও হাইড্রোলিক কাটারের সাহায্যে উদ্ধারকারীরা অবশেষে সুড়ঙ্গের মুখ খুঁজে পান এবং ভিতরে প্রবেশ করেন। তবে ডাকাডাকি করেও কোনও শ্রমিকের সাড়া পাওয়া যায়নি।

এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে উপগ্রহচিত্রও বিশ্লেষণ করছেন বিজ্ঞানীরা। বুধবার হড়পা বান আসার সময় আকাশ মেঘে ঢাকা থাকায় সেই সময়ের স্পষ্ট উপগ্রহচিত্র পাওয়া যায়নি। তবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার থেকে এলাকার তুলনামূলক পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়। সেই ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের একাংশের ধারণা, শুধু হিমবাহে নয়, পাহাড়ের শক্ত শিলাস্তরেও বড় ধরনের ধস নেমেছিল। সেই ধসের প্রভাবে হিমবাহে ভাঙন তৈরি হয় এবং বিপুল বরফ, পাথর ও মাটি নিচের দিকে গড়িয়ে পড়তে থাকে। বরফ গলতে গলতে তার সঙ্গে মিশে যায় জল, কাদা ও পাথর। এই বিশাল জল-কাদা-পাথরের প্রবাহই শেষ পর্যন্ত পাহাড়ি নদীগুলির জলস্তর ও স্রোতের শক্তি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়ে জনপদগুলিকে কার্যত ভাসিয়ে নিয়ে যায়।