উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : এক হাতে জীবন, অন্য হাতে জীবিকা। পেটের টানে প্রতিদিন সেই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই সুন্দরবনের গহিন জঙ্গলের পথে পা বাড়ান তাঁরা। সামনে কাদামাটির খাঁড়ি, চারদিকে গরান-গেঁওয়া-সুন্দরী গাছের ঘন জঙ্গল, আর অদৃশ্য বিপদের মতো ঘুরে বেড়ায় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। সেই জঙ্গলের খাঁড়িতে কাঁকড়া ধরাই তাঁদের জীবিকা। কখনও সাত দিন, কখনও পনেরো দিন, আবার কখনও টানা এক মাস নৌকায় কাটিয়ে ঘরে ফেরেন তাঁরা। তবে সেই ফেরা যে নিশ্চিত, তার কোনও নিশ্চয়তা নেই।জঙ্গলে ঢোকার আগে তাই নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মাথা নত করেন ‘মা বনবিবি’র কাছে। প্রার্থনা একটাই—যেন নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারেন।পরিবারের সদস্যদের চোখেও তখন উৎকণ্ঠা। কারণ তাঁরা জানেন, যে মানুষটি নৌকায় চেপে সুন্দরবনের গভীরে যাচ্ছেন, তিনি আদৌ জীবিত অবস্থায় ফিরবেন কি না, তার নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।সুন্দরবনের কাদা কাঁকড়ার চাহিদা আজ শুধু দেশের বাজারে সীমাবদ্ধ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারেও এই কাঁকড়ার যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। আকার, গুণমান ও ঋতুভেদে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁকড়ার দাম কেজিপ্রতি কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন বাজারে সুন্দরবনের কাঁকড়া পৌঁছে যায়। চিন, জাপান, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া সহ বিভিন্ন দেশের বাজারে এই কাঁকড়ার চাহিদা রয়েছে। প্রক্রিয়াজাত ‘সফট শেল’ কাঁকড়ার ক্ষেত্রেওবিদেশি বাজারে আগ্রহ ক্রমশ বাড়ছে।
অর্থাৎ সুন্দরবনের কাঁকড়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হয়ে উঠছে। কিন্তু এই বাণিজ্যের একেবারে গোড়ায় যাঁরা রয়েছেন, সেই কাঁকড়া শিকারিদের জীবনে সেই বাজারের সাফল্যের ছিটেফোঁটাও যেন পৌঁছয় না।
তাঁদের ঘরে এখনও অভাব। ছোট কুঁড়েঘর, অনিশ্চিত আয়, নিরাপত্তাহীন জীবন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উদ্বেগ—এই নিয়েই তাঁদের সংসার।
কাঁকড়া ধরতে জঙ্গলে ঢোকার জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি ও বৈধ ‘পাশ’ নিয়ে তাঁরা নির্দিষ্ট এলাকায় প্রবেশ করেন। কিন্তু বৈধ অনুমতি থাকলেও বিপদ কমে না।জঙ্গলের ভিতরে কখন কোথা থেকে বাঘ বেরিয়ে আসবে,তা কেউ জানেন না। নৌকা থেকে নেমে কাদার মধ্যে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে কাঁকড়া ধরতে হয়। কখনও খাঁড়ির পাড়ে, কখনও ম্যানগ্রোভের ঝোপের পাশে, কখনও আবার এমন জায়গায় যেতে হয় যেখানে কয়েক মুহূর্তের অসতর্কতাই জীবন কেড়ে নিতে পারে।বাঘের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হল তার অতর্কিত আক্রমণ। সুন্দরবনের বহু কাঁকড়া শিকারি ও মৎস্যজীবী পিছন থেকে আসা বাঘের হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। কেউ কেউ আবার কোনওমতে প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন,কিন্তু চিরতরে হারিয়েছেন কর্মক্ষমতা।কুলতলির একজন কাঁকড়া শিকারির কথায় সেই বাস্তবতারই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। গভীর জঙ্গলে রওনা হওয়ার আগে তিনি বলেন, “কাঁকড়া ধরতে গেলে অনেক রিস্ক থাকে। কিন্তু আমাদের মাছ-কাঁকড়া ধরেই জীবিকা নির্বাহ করতে হয়। ফরেস্ট থেকে অনুমতি নিয়ে আমরা সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢুকি। সাতদিন পর ফিরি। এখানে সবাই আমরা মাছ-কাঁকড়া ধরেই জীবিকা নির্বাহ করি।”
এই কয়েকটি কথার মধ্যেই সুন্দরবনের হাজার হাজার মানুষের জীবনসংগ্রামের ছবি ফুটে ওঠে।বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাবই তাঁদের বার বার সেই বিপজ্জনক পথে ঠেলে দেয়। তাঁরা জানেন জঙ্গলে গেলে বাঘের মুখোমুখি হতে পারেন। জানেন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। জানেন ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে নৌকা বিপদে পড়তে পারে। তবু যেতে হয়। কারণ ঘরে রেখে যাওয়া সন্তান, স্ত্রী, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখ তাঁদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।জীবনের ঝুঁকি নেবেন না—এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তাঁদের হাতে নেই। কারণ কাজ না করলে সংসারে খাবার জুটবে না।এই জায়গাতেই সুন্দরবনেরকাঁকড়া শিকারিদের জীবনযুদ্ধ সবচেয়ে নির্মম হয়ে ওঠে।আন্তর্জাতিক বাজারে সুন্দরবনের কাঁকড়া যখন মূল্যবান পণ্য, তখন সেই কাঁকড়া সংগ্রহকারী মানুষের জীবন কেন এত সস্তা—এই প্রশ্ন আজ আরও জোরালো হয়ে উঠছে।কাঁকড়া শিকারিদের অভিযোগ, বাঘের আক্রমণে কেউ মারা গেলে তাঁদের পরিবারের সামনে নতুন করে শুরু হয় আরেক লড়াই। সরকারি ক্ষতিপূরণ বা সাহায্য পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা আইনি জটিলতা, বৈধ ‘পাশ’-এর প্রশ্ন এবং নথিপত্রের সমস্যায় অনেক পরিবার দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে বাধ্য হয়। কেউ সরকারি সহায়তা পান, কেউ আবার বিভিন্ন জটিলতায় বঞ্চিত থাকেন।আর তাই তো এইসব অসহায় মানুষদের এই অধিকার ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘ দিন ধরে সুন্দরবনের কুলতলি, মৈপীঠ, রায়দীঘি,পাথরপ্রতিমা, নামখানা,গোসাবা,রায়দীঘি এলাকায় লড়াই করে চলেছে এপিডিআর নামে একটা মানবাধিকার সংগঠন।সেই সংগঠনের কথায়,সরকার বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুক, এদের বাঘের আক্রমনে কিছু ঘটলে দ্রুত সরকারি সহায়তা, পারিবারিক সহায়তা করা হোক।একজন উপার্জনক্ষম মানুষকে হারানোর পর একটি পরিবারের সামনে যে বিপর্যয় নেমে আসে,তা শুধু টাকার অঙ্ক দিয়ে মাপা যায় না।সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, সংসারে খাবারের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, ঋণের বোঝা বাড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের জীবন ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।২০২৬ সালে মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে পাঁচজন মানুষের বাঘের হামলায় মৃত্যুর খবর সুন্দরবনের মানুষের উদ্বেগ আর ও বাড়িয়েছে।চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত বাঘের আক্রমণে মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক। প্রতিটি মৃত্যুর পিছনে রয়েছে একটি পরিবার,একটি সংসার এবং অসংখ্য অসমাপ্ত স্বপ্ন।
সুন্দরবনের মানুষ তাই শুধু ক্ষতিপূরণ চান না। তাঁরা চান নিরাপদ জীবিকা।কাঁকড়া শিকারিদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন। কাঁকড়া চাষ, মৎস্যচাষ, কাঁকড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াকরণ, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মাধ্যমে স্থানীয় উদ্যোগ,পর্যটন কেন্দ্রিক কর্মসংস্থান এবং সুন্দরবনের পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন পেশার সুযোগ বাড়ানো গেলে জঙ্গলের উপর মানুষের নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব।একই সঙ্গে জঙ্গলে যাঁরা প্রবেশ করেন,তাঁদেরনিরাপত্তার বিষয়টিও নতুন করে ভাবতে হবে।প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জাম, যোগাযোগ ব্যবস্থা,জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনা বা বাঘের আক্রমণের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা ও উদ্ধার নিশ্চিত করা জরুরি।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত করতে হবে। বৈধ কাগজপত্রের জটিলতায় কোনও পরিবার যেন বছরের পর বছর সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় না থাকে, তা নিশ্চিত করা দরকার।কারণ সুন্দরবনের মানুষ জঙ্গলের শত্রু নন। তাঁরা এই জঙ্গলের সঙ্গে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সহাবস্থান করে আসছেনতাঁদের জীবিকা যেমন জঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত, তেমনই সুন্দরবনের পরিবেশ রক্ষার সঙ্গেও তাঁদের জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।সুন্দরবনের কাঁকড়া আজ আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে।বিদেশের রেস্তরাঁয় সেই কাঁকড়া দামি খাবার হিসেবে পরিবেশিত হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা লাভ করছেন, রফতানিকারকেরা বাজার বাড়াচ্ছেন,আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও বিস্তৃত হচ্ছে। কিন্তু সেই কাঁকড়ার পিছনে যে মানুষের ঘাম, ভয় এবং কখনও কখনও রক্ত মিশে আছে, সেই মানুষগুলির কথা কি আমরা যথেষ্ট ভাবছি?নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে যখন কোনও কাঁকড়া শিকারি ‘মা বনবিবি’র কাছে প্রার্থনা করেন, তখন তাঁর প্রার্থনা খুব সাধারণ—তিনি যেন জীবিত অবস্থায় ঘরে ফিরতে পারেন।কিন্তু একটি সভ্য সমাজে একজন শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা শুধুমাত্র ঈশ্বরের আশীর্বাদের উপর নির্ভর করতে পারে না।
তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। তাঁর জীবিকার নিশ্চয়তা প্রশাসনের দায়িত্ব।তাঁর পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার দায়িত্বও সমাজ ও সরকারের।সুন্দরবনের কাঁকড়ার দাম আন্তর্জাতিক বাজারে যতই বাড়ুক, সেই কাঁকড়া শিকারির জীবনের দাম যদি না বাড়ে, তবে এই উন্নয়ন অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।আজ সুন্দরবনের কাঁকড়া বিশ্ব বাজারে পরিচিত।এবার সুন্দরবনের কাঁকড়া শিকারিদের জীবনও উন্নয়নের আলোয় আসুক।কারণ তাঁদের বুক চিরে যেন একটাই প্রশ্ন বেরিয়ে আসে—মানুষের জীবনের চেয়ে কি কাঁকড়ার দাম সত্যিই বেশি,এটা নিয়ে ভাববার দরকার আছে সরকারের।