উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : একদিকে নদীর নোনা জল, অন্যদিকে ঘন অন্ধকার জঙ্গল।জোয়ার-ভাটার হিসেব করে কখনও নৌকা ভাসাতে হয়, কখনও আবার জঙ্গলের কিনার ঘেঁষে মাছ-কাঁকড়া ধরতে হয়। মাথার উপর তখন একটাই ভয়—কখন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে ‘সে’। সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের কাছে এই ভয় কোনও গল্প নয়, প্রতিদিনের বাস্তবতা। জীবিকার তাগিদে সেই ভয়কে সঙ্গী করেই তাঁদের পা পড়ে সুন্দরবনের নদী-খালে।সেই জীবনযুদ্ধেই এবার বাঘের হামলার শিকার কুলতলির মৈপিঠ-নগেনাবাদ এলাকার মৎস্যজীবী আজিজ মোল্লা।গত ২ শে সেপ্টেম্বর সূর্যমনি খালে মাছ ধরার সময় আচমকাই জঙ্গল থেকে বাঘ বেরিয়ে এসে তাঁর উপর হামলা চালায় বলে অভিযোগ।গুরুতর জখম অবস্থায় সঙ্গীরা তাঁকে উদ্ধার করেন।পরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। বর্তমানে কলকাতার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আনসার। হাসপাতালের শয্যায় তাঁর লড়াই এখন শুধুই প্রাণে বাঁচার নয়—তাঁর পরিবারের সামনে প্রশ্ন, আগামী দিন কীভাবে চলবে?সুন্দরবনের বহু পরিবারের জীবন নদী আর জঙ্গলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে। কেউ মাছ ধরেন, কেউ কাঁকড়া সংগ্রহ করেন, কেউ নদীর নোনা জলে জীবিকার সন্ধান করেন। ঝুঁকির কথা তাঁরা জানেন।জানেন,সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢোকার অর্থ শুধু নদীর স্রোত, ঝড় কিংবা কুমিরের ভয় নয়—বাঘের হামলার আশঙ্কাও সেখানে প্রতি মুহূর্তে।তারপর ও নৌকা থামে না।আজিজ মোল্লা ও পাঁচ সঙ্গীকে নিয়ে সেই জীবিকার সন্ধানেই ট্রলারে করে বেরিয়েছিলেন।
সূর্যমনি খালে মাছ ধরার সময় আচমকা ঘটে যায় বিপদ। জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসে বাঘ তাঁর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে অভিযোগ। মুহূর্তের মধ্যে বদলে যায় পাঁচ মৎস্যজীবীর স্বাভাবিক দিনের ছবি। সহকর্মীদের তৎপরতায় গুরুতর আহত আনসারকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়।কিন্তু এরপর শুরু হয় আরেক লড়াই—হাসপাতালে জীবনের লড়াই এবং বাড়িতে পরিবারের বেঁচে থাকার লড়াই।আনসারের শরীরে বাঘের আক্রমণের ক্ষত। চিকিৎসার জন্য তাঁকে কলকাতার পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।পরিবারের কাছে এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা তাঁরচিকিৎসা।কারণ পরিবারের উপার্জনক্ষম একজন মানুষ যখন হাসপাতালে, তখন সংসারের চাকা সচল রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।এই পরিস্থিতিতেই আহত মৎস্যজীবীর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। সংগঠনের পক্ষ থেকে আনসারের চিকিৎসার পাশাপাশি দ্রুত সরকারি ক্ষতিপূরণের দাবি জানানো হয়েছে।এপিডিআরের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ আহমেদ বলেন, বাঘের আক্রমণে আহত হওয়ার পর একজন মৎস্যজীবীর পরিবারকে যাতে আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সেই কারণেই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দ্রুত পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।ঘটনার পর শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, বাঘের হামলার প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে ঘটনাস্থল তদন্তের উদ্যোগ নেয় এপিডিআর। সংগঠনের পক্ষ থেকে বনদপ্তরের নলগোড়া বিট অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর পরিবারের সদস্য এবং আনসারের সঙ্গে থাকা দুই মৎস্যজীবী-সহ মোট চারজনকে নিয়ে তদন্তকারী দল ঘটনাস্থলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।সঙ্গে ছিলেন মৈপিঠ কোস্টাল থানার একজন পুলিশকর্মী এবং বনদপ্তরের পাঁচ কর্মী।কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পর এপিডি আরের দাবি, মৈপিঠ সোমবারের ঘাট থেকে দুপুর সাড়ে তিনটে নাগাদ দলটি রওনা দেয়। সূর্যমনি খালের ঘটনাস্থলে পৌঁছতে সন্ধ্যা হয়ে যায়।প্রায় ৬টা ২২ মিনিট নাগাদ সেখানে পৌঁছনোর পর দেখা যায়, জোয়ারের জলে এলাকা ভরে রয়েছে। ফলে পর্যাপ্তভাবে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা সম্ভব হয়নি।শেষ পর্যন্ত অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই তদন্ত শেষ করতে হয়।এপিডিআরের সাধারণ সম্পাদক আলতাফ আহমেদ বলেন,সন্ধ্যার অন্ধকারে এবং জোয়ারের জলে ডুবে থাকা অবস্থায় ঘটনাস্থল পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব নয়। তাই দিনের আলোয় ফের ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।আজিজ মোল্লার সঙ্গে সেদিন থাকা পাঁচ মৎস্যজীবী—আনচার মোল্লা, আলম মোল্লা, হজরত মোল্লা, রাজ্জাক মোল্লা ও হাপিজুল মোল্লাকে সঙ্গে নিয়েই ফের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হোক।কারণ, ঘটনার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁদের। কোথায় আনসার মাছ ধরছিলেন, কোন দিক থেকে বাঘ এসেছিল, হামলার পর কী হয়েছিল—এই সমস্ত বিষয় তাঁদের বক্তব্যের মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হতে পারে বলে মনে করছে সংগঠনটি।ঘটনার পুনরায় তদন্তের মাধ্যমে সঠিক রিপোর্ট তৈরি করা প্রয়োজন বলেও দাবি এপিডিআরের।আহত মৎস্যজীবীর পরিবারের জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণের দাবিও জোরালো করেছে সংগঠনটি।এপিডিআরের দাবি, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ এবং ২০১৮ সালের রাজ্য সরকারি আদেশ অনুযায়ী আজিজ মোল্লার পরিবারকে ৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।তারা এও বলেন, সুন্দরবনে মাছ ও কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণের ঝুঁকি নতুন নয়। এই ঝুঁকি নিয়েই বছরের পর বছর জীবিকা নির্বাহ করছেন হাজার হাজার মানুষ। তাঁদের কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু সহানুভূতি নয়, দ্রুত প্রশাসনিক সহায়তা এবং সরকারি ক্ষতিপূরণও প্রয়োজন।সুন্দরবনের বাঘ শুধু জঙ্গলের প্রাণী নয়, এই অঞ্চলের মানুষের কাছে একই সঙ্গে বিস্ময়, ভয় এবং বাস্তবতার নাম। একদিকে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই, অন্যদিকে সেই জঙ্গলের আশপাশে বসবাসকারী মানুষের জীবন ও জীবিকার লড়াই—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।বাঘ সংরক্ষণ জরুরি।সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য বাঘের অস্তিত্ব অপরিহার্য। কিন্তু সেই সঙ্গে সুন্দরবনের মানুষের নিরাপত্তা ও জীবিকাও দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নদী জঙ্গলের উপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে সুন্দরবন শুধুমাত্র পর্যটনের জায়গা নয়; এটাই তাঁদের সংসার চালানোর অবলম্বন।আজিজ মোল্লার ঘটনা সেই পুরনো প্রশ্নটাকেই আবার সামনে নিয়ে এল—জীবিকার প্রয়োজনে জঙ্গলে যাওয়া মানুষগুলির নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত? দুর্ঘটনা বা বাঘের হামলার পরে তাঁদের পরিবার কত দ্রুত সরকারি সহায়তা পায়? আর কোনও ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত কতটা স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ হয়?সুন্দরবনের মানুষের জীবন থেকে বাঘকে আলাদা করা সম্ভব নয়। একইভাবে সুন্দরবনের মানুষের জীবিকাকেও জঙ্গল থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করা কঠিন। তাই সংঘাত কমাতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিরাপদে মাছ ধরার ব্যবস্থা, জঙ্গলে প্রবেশের ক্ষেত্রে নজরদারি, প্রশিক্ষণ, দ্রুত উদ্ধারব্যবস্থা এবং দুর্ঘটনার পরে নির্ভরযোগ্য সরকারি সহায়তা।আজিজ মোল্লা এখন হাসপাতালের শয্যায়। তাঁর পরিবার অপেক্ষায়—কবে তিনি সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরবেন। আর সেই অপেক্ষার মধ্যেই এপিডিআরের দাবি, দ্রুত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হোক, চিকিৎসায় সহায়তা করা হোক এবং দিনের আলোয় ফের ঘটনাস্থল তদন্ত করা হোক।সুন্দরবনের নদীতে আবার নৌকা ভাসবেজীবিকার টানে আবার জঙ্গলের কাছে যাবেন মৎস্যজীবীরা। হয়তো তাঁদের চোখে থাকবে সতর্কতা, মনে থাকবে ভয়। কিন্তু পেটের দায়ে সেই ভয়কে অতিক্রম করেই চলতে হবে তাঁদের।সেই কারণেই আনসারের লড়াই শুধু একজন আহত মৎস্যজীবীর লড়াই নয়। এটি সুন্দরবনের সেইসব মানুষের লড়াই, যাঁরা প্রতিদিন বাঘের চোখে চোখ রেখে জীবিকার সন্ধানে নদীতে নামেন।বাঘের চোখে চোখ রেখে জীবনযুদ্ধ,পরিবারের পাশে ক্ষতিপূরণের দাবিতে এপিডিআর
আসলাম হোসেন
প্রকাশিত:
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:০৯
আরও খবর
বিজেপির হবে হার, তৃণমূল জিতবে আবার: পদ্ম শিবিরকে ‘অ্যান্টি বেঙ্গল’ তোপ মমতার
আজ ইন্ডোরে কর্মীদের নিয়ে বিশেষ বৈঠক মমতার
হাওড়ায় স্বচ্ছ ভারত অভিযানে শুভেন্দু
প্রধানমন্ত্রীর বিদেশনীতিকে ‘রসিকতা’ হিসেবে দেখছে বিশ্ব, মোদিকে আক্রমণ রাহুল গান্ধীর
ভয়ঙ্কর বায়ু দূষণে ইউরোপ, গত এক বছরে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে জানেন! সংখ্যা শুনলে শিউরে উঠবেন
ভয়ঙ্কর বায়ু দূষণে ইউরোপ, গত এক বছরে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে জানেন! সংখ্যা শুনলে শিউরে উঠবেন
সব মামলাতেই পেলেন জামিন, এক দশক পর জেলমুক্তি হতে চলেছে সারদা কর্তা সুদীপ্তর
সব মামলাতেই পেলেন জামিন, এক দশক পর জেলমুক্তি হতে চলেছে সারদা কর্তা সুদীপ্তর
প্রার্থী ঘোষণার পরেই অশান্তি বিজেপিতে, সিতাইয়ে ভেস্তে গেল বৈঠকে
প্রার্থী ঘোষণার পরেই অশান্তি বিজেপিতে, সিতাইয়ে ভেস্তে গেল বৈঠকে
সৌদি আরবে রমজানের চাঁদ দেখা গেছে, আজ থেকে রোজা শুরু
সৌদি আরবে রমজানের চাঁদ দেখা গেছে, আজ থেকে রোজা শুরু
বিদ্যালয়ে ঢুকে প্রেমিকার গলায় ছুরির কোপ প্রেমিকের, বাঁচাতে গিয়ে আক্রান্ত নাবালিকার বাবা
বিদ্যালয়ে ঢুকে প্রেমিকার গলায় ছুরির কোপ প্রেমিকের, বাঁচাতে গিয়ে আক্রান্ত নাবালিকার বাবা
সর্বাধিক পাঠিত
দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বিদ্যুৎ পরিষেবায় বড় উদ্যোগ, তৈরি হচ্ছে ৬ নতুন সাব স্টেশন
আইএসএলে খেলার সম্ভাবনা নেই মহামেডানের, ডায়মন্ড হারবারকে ছাড়াই ১৩ দল নিয়ে প্রতিযোগিতার পরিকল্পনা ফেডারেশনের
কৈলাস-মানস সরোবর দর্শনের স্বপ্ন নিয়ে নেপালে, হড়পা বানে নিখোঁজ ডায়মন্ড হারবারের শিক্ষিকা
ডায়মন্ড হারবার মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৃতীয় সমাবর্তন, রাজ্যপালের হাত থেকে পুরস্কার পেলেন প্রায় ১০০০ মহিলা
কেপিএসসি নিয়োগ কেলেঙ্কারি: সিআইডি-র হাতে গ্রেফতার আইএএস অফিসার জ্ঞানেন্দ্র কুমার গ্যাংওয়ার
কেপিএসসি নিয়োগ কেলেঙ্কারি: সিআইডি-র হাতে গ্রেফতার আইএএস অফিসার জ্ঞানেন্দ্র কুমার গ্যাংওয়ার
প্রধানশিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধিতে নেপালের হড়পা বানে প্রাণ বাঁচল ১৬৪৩ পড়ুয়ার
প্রধানশিক্ষকের উপস্থিত বুদ্ধিতে নেপালের হড়পা বানে প্রাণ বাঁচল ১৬৪৩ পড়ুয়ার
বিশ্বরেকর্ড গড়লেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
বিশ্বরেকর্ড গড়লেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো
পুজোর মুখে বড় সুখবর, পঞ্চায়েত কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করল রাজ্য সরকার
পুজোর মুখে বড় সুখবর, পঞ্চায়েত কর্মীদের মহার্ঘ ভাতা ঘোষণা করল রাজ্য সরকার
সরকারি স্কুলের সিলেবাস বদল ও পাশ ফেল চালুর ভাবনা শিক্ষা দফতরের