উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের মানুষের জীবন জীবিকা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।বিশেষ করে সুন্দরবনের মহিলাদের জীবিকা, আয় ও স্বাস্থ্য নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে হচছে। এই পরিস্থিতিতে সুন্দরবনের মহিলাদের স্বনির্ভর করে তুলতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায় সক্ষম করে তুলতে চালু হলো একটি নতুন উদ্যোগ। ‘নারী নেতৃত্বাধীন জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা উন্নয়ন প্রকল্প’-এর মাধ্যমে গোসাবা ব্লকের দুটি গ্রামে ১৫০ জন মহিলাকে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিকল্প ও জলবায়ু-সহনশীল জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সাচি ওয়াটার্স এবং  সহযোগিতায় করে এইচ পি সি এল। গোসাবা ব্লকের চাঁদিপুর ও হেতালবাড়ি—এই দুটি গ্রামকে প্রকল্পের আওতায় নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে।

প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হল পরিবেশ, জীবিকা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে সমন্বিত এবং জলবায়ু-স্মার্ট উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি মহিলাদের নেতৃত্বে সমষ্টিগত উদ্যোগ গড়ে তোলা।প্রকল্প সূত্রে জানা গিয়েছে, সুন্দরবনের মহিলাদের জীবিকা ও স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তন বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। ঘনঘন বন্যা, সীমিত জীবিকার সুযোগ, কম আয়, ভূমিহীনতা বা প্রান্তিক কৃষক পরিবারের উপর নির্ভরশীলতা—এই সমস্ত সমস্যার কারণে বহু মহিলা আর্থিকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন।সেই কারণে জলবায়ু-সহনশীল জীবিকা এবং প্রজনন স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁদের কারিগরি দক্ষতা বাড়ানোর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।প্রকল্পের আওতায় মোট সাতটি জীবিকা ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে কম্পোস্টযোগ্য স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরি ও বাজার জাতকরণ,সৌরশক্তি চালিত সবজি শুকানো ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ,ঔষধি ও ভেষজ উদ্ভিদ চাষ, মাড ক্র্যাব চাষ ও মোটাতাজাকরণ, ম্যানগ্রোভ নার্সারি তৈরি ও রোপণ পদ্ধতি, মৌমাছি পালন এবং টেরাকোটা কাটলারি ও পরিবেশবান্ধব সামগ্রী তৈরি।
প্রতিটি প্রশিক্ষণ ট্র্যাকে প্রায় ৩০ জন করে মহিলা প্রশিক্ষণ নেন।প্রকল্প বাস্তবায়নে কয়েকটি বিশেষ নীতির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। বাজার সমীক্ষা এবং মহিলাদের আগ্রহের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণের বিষয় নির্ধারণ করা হয়।পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেমোকাবিলা করতে সক্ষম জীবিকা, বাজারের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ, ক্রেতা নেটওয়ার্ক ও ন্যায্য মূল্যের বাজার তৈরির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।গোসাবারচাঁদিপুরে দুদিনের এই কর্মশালায় গ্রামভিত্তিক কমিউনিটি মিটিং এবং ইনসেপশন ওয়ার্কশপের আয়োজন করা হয়েছিল।সেখানে উপকারভোগী মহিলা, স্থানীয় কমিউনিটি নেতা এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে প্রকল্পের লক্ষ্য ও পরিকল্পনা জানেন।
এর মাধ্যমে প্রকল্প সম্পর্কে স্বচ্ছতা তৈরি, স্থানীয় মানুষের মতামত যাচাই এবং প্রশিক্ষণ ও উদ্যোগে কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়।কর্মশালার শেষে দুটি গ্রামের চূড়ান্ত ১৫০ জন উপকারভোগীর তালিকা, সাতটি আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত এলআইজি স্বাক্ষরিত কমিউনিটি চুক্তি এবং প্রশিক্ষণের সময়সূচি তৈরি করা হয়।পাশাপাশি অংশীজনদের মতামত-সহ একটি মোবিলাইজেশন রিপোর্টও প্রস্তুত করা হয়।প্রকল্পের সময়রেখা অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকল্পের সূচনা ও ইনসেপশন ওয়ার্কশপের পাশাপাশি কমিউনিটি মোবিলাইজেশন এবং গ্রামভিত্তিক সমীক্ষার কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৭ পর্যন্ত চলবে বিভিন্ন দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ। এরপর মার্চ ২০২৭-এ প্রকল্পের সমাপ্তি পর্বে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলাদের শংসাপত্র প্রদান এবং স্বনির্ভর উদ্যোগ শুরু করার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।সুন্দরবনের মতো জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মহিলাদের নিজস্ব দক্ষতা ও স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করাই এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। এর ফলে একদিকে যেমন মহিলাদের আয় ও স্বনির্ভরতার সুযোগ তৈরি হতে পারে, অন্যদিকে পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ু সহনশীল উদ্যোগের মাধ্যমে সুন্দরবনের স্থানীয় অর্থনীতিতেও নতুন সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।