ইনামুল হক: রিলিজিয়ান প্ল্যাটফর্ম থেকে যে শিক্ষা শুরু হয় সেই শিক্ষাই মানুষকে সত্যিকারের মনুষত্ব শেখায়। আমরা বলতে পারি- মানুষ আজ চাঁদে পৌঁছতে পেরেছে, চাঁদের থেকেও আগে যাওয়ার চেষ্টা করছে। আনিসুর রহমান সাহেবকে বলছি, আপনি স্কুল বানিয়েছেন, কলেজ বানিয়েছেন, এখন জরুরি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি।'

বুধবার উত্তর ২৪ পরগনার বেড়াচাঁপার কাউকেপাড়ায় রহমতে আলম মিশনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম আলহাজ্ব মাওলানা সিরাজুল ইসলামের স্মরণে ‘আন্তর্জাতিক শিক্ষা সভা' শীর্ষক অনুষ্ঠানে কথাগুলি বলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ জামিয়া ইসলামিয়া ইশাতুল উলুম-এর সভাপতি শাইখ মাওলানা হুজাইফা গোলাম মুহাম্মদ বস্তানভী। তিনি বলেন, এই দুনিয়ায় যে কোনও মানুষ শিক্ষা ছাড়া ভবিষ্যৎ পরিচালনা করতে পারবে না। শিক্ষা ছাড়া ভবিষ্যতের কোনও দাম নেই। যদি আপনি ভালো ব্যবসায়ী হতে চান, অবশ্যই আপনার তালিমের প্রয়োজন আছে। আপনি যদি শিক্ষক হন, আপনাকে ভালো  শিক্ষা দিতে হবে। আপনি যদি না পড়াতে পারেন, তাহলে আপনি কোনওদিন ভালো শিক্ষক হতে পারবেন না।' ছাত্রছাত্রীদের প্রতি দায়িত্বশীল থেকে এই প্রতিষ্ঠানের তরফে উপযুক্ত শিক্ষা প্রদানের তিনি প্রশংসা করেন। পাশাপাশি তিনি পরামর্শ দেন এখানে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার।

[caption id="attachment_88038" align="alignnone" width="1200"] রহমতে আলম মিশনের মূল প্রবেশদ্বারে ফলক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আনিসুর রহমান, মাওলানা হুজাইফা গুলাম মুহাম্মদ, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম, আহমদ হাসান ইমরান প্রমুখ।[/caption]

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু কমিশনের চেয়ারম্যান আহমদ হাসান ইমরান বলেন, সংখ্যালঘুদের শিক্ষায় এগিয়ে নিয়ে যেতে যেসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার মধ্যে অগ্রণী রহমতে আলম মিশন। ২০০৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানের সূচনা হয়েছিল মরহুম সিরাজুল ইসলামের স্বপ্নের মধ্যে দিয়ে।

আজ আমার গর্ব হয় সেদিন এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে এসেছিলাম। তারপরেও এসেছি।'

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মরহুম সিরাজুল ইসলামের সুযোগ্য পুত্র শিক্ষাব্রতী আনিসুর রহমানের উদ্যোগে এই প্রতিষ্ঠান এগিয়ে চলেছে। আজকের এই সেমিনার এখানকার ছাত্রছাত্রীদের একটি বড় পাওনা। আমি গর্বিত এখানকার শিক্ষার্থীদের অনেকেই ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ছাড়াও বিডিও, ট্যাক্স অফিসার-সহ বিভিন্ন সরকারি পদে কর্মরত।

রহমতে আলমের এই শিক্ষা বিপ্লবকে ধরে রাখতে হবে।' ইমরান সাহেব ছাত্রীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ইসলামের বুনিয়াদ মেয়েদের দ্বারাই রচিত হয়েছিল। হযরত মুহাম্মদ সা. মা খাদিজা রা.-এর কাছেই আল্লাহ্র ঐশীবাণীকে প্রথম নিয়ে এসেছিলেন। সবচেয়ে বেশি হাদিস মা আয়েশা রা.-এর কাছেই সংগৃহীত ছিল। মেয়েরাই ইসলামের ভিত্তি পতাকাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাই নারী শিক্ষার প্রয়োজন। একজন পুরুষের শিক্ষা চৌকাঠ পর্যন্ত পৌঁছয় আর একজন নারীর ইসলামি শিক্ষা ঘরের মধ্যে চলে আসে। তাঁরা ঘর, পরিবার তথা গোটা সমাজকে শিক্ষার আলো দেয়। মেয়েরা শিক্ষার বাহক।'

ইমরান বলেন, 'রহমতে আলমের অর্থ, সারা পৃথিবীর জন্য রহমত স্বরূপ আর তিনি হলেন আমাদের প্রিয় নবীজি।

'

তাঁর জীবন-আদর্শকে বেশি করে জানার জন্য তিনি মিশন কর্তৃপক্ষকে নবী দিবসের অনুষ্ঠান করার প্রস্তাব দেন। তিনি আরও বলেন, হিন্দু ভাইদের মধ্যে ইসলামের আদর্শকে ভালো করে জানাতে হবে। নিজের চরিত্র, জ্ঞান দ্বারা সারা পৃথিবীতে ইসলামকে ছড়িয়ে দিতে হবে। এজন্য ছেলেমেয়ে উভয়কেই এগিয়ে আসতে হবে।’

এ দিন অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন, আল-আমীন মিশনের সম্পাদক এম নুরুল ইসলাম। তিনি আবাসিক স্কুলের শিক্ষাকে ইসলামিক কৃষ্টি ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে আধুনিক শিক্ষায় উত্তরণ ঘটানোর পরম্পরাকে ধরে রাখার জন্য রহমতে আলম মিশনের ভূমিকার প্রশংসা করেন। এ দিন অনুষ্ঠানে উপস্থিত দারুল উলুম দেওবন্দের কন্ট্রোলার অফ এক্সামিনেশনস শাইখ মাওলানা সালমান বিজনোরি বলেন, ‘ইসলামে জ্ঞান অর্জন করার সঙ্গে সঙ্গে তালিমের প্রয়োজন আছে। আল্লাহ্তায়ালার তরফ থেকে আমাদের পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সা.-এর উপর যা নাযিল হয়েছিল তা কুরআনের আয়াত রূপে। আল্লাহ্তায়ালা যেটা বলেছেন বা শিখিয়েছেন, সেটাই হল সত্যিকারে শিক্ষা। তালিমের অর্থ হচ্ছে শেখানো। এর সঙ্গেই রয়েছে ইলম বা জ্ঞান। আপনি যদি কোনও মানুষকে ভালো ইলমওয়ালা মানুষ বানাতে চান, তার জন্য চাই তালিম।'

এ দিনের শিক্ষা সভার মূল বিষয়বস্তু ছিল 'উপযুক্ত ও দায়িত্বশীল বিশ্ব নাগরিক গড়ে তোলা'। এ বিষয়ের উপর বক্তব্য রাখেন মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. সুহাইমী মুহাম্মদ শরীফ।

তিনি বলেন, 'একজন শিক্ষার্থী প্রথমেই তার শিক্ষককে সম্মান জানাবে। তারপর তার শিক্ষা বা পাঠকে সম্মান করবে। এরপর সহবত শিক্ষার মধ্য দিয়ে সেই শিক্ষার্থী তার পরিবার, সমাজ, প্রকৃতি, পশু-পাখির প্রতি সম্মান জানাতে শিখবে। সর্বোপরি তার স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাশীল হতে শিখবে।'

[caption id="attachment_88039" align="alignnone" width="1000"] মঞ্চে এম আর গ্রুপ অফ ইনস্টিটিউশনস-এর ডিরেক্টর ড. জাহিদুল সরকার।[/caption]

এ দিন বিশিষ্টদের উপস্থিতিতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিডিও-সহ বিভিন্ন সরকারি আধিকারিক পদে অধিষ্ঠিত রহমতে আলম মিশনের ৪০ জন কৃতীকে বিশেষভাবে সংবর্ধিত করা হয়। এ ছাড়াও চন্দ্রযানের সাফল্যের নেপথ্য কারিগর ইসরোর গবেষক দেগঙ্গার ভূমিপুত্র আমিনুর হোসেনের আব্বা আবদুল জলিল মণ্ডলকে বিশেষভাবে সংবর্ধিত করেন রহমতে আলম মিশনের সম্পাদক আনিসুর রহমান। সংবর্ধনা দেওয়া হয় রাজ্যে উচ্চমাধ্যমিকে দ্বিতীয় স্থানাধিকারী আবু সামাকে। মিশনের সম্পাদক আনিসুর রহমান বিদেশের মা মরহুমা জাহানারা বেগম ও আব্বা মরহুম সিরাজুল ইসলামের নামে জেএস মেরিট স্কলারশিপ চালু করা হয় এদিন। আবু সামার হাতে ১২ হাজার টাকার এই স্কলারশিপ তুলে দেওয়া হয়।

সভায় বক্তব্য রাখেন মালয়েশিয়ার  ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, রামকৃষ্ণ মিশনের মহারাজ স্বামী জ্ঞানালোকানন্দ, রহমতে আলম মিশনের সভাপতি মুহাম্মদ আয়ূব আলি, মিশনের কোষাধ্যক্ষ মাওলানা আমিনুল আম্বিয়া, বিডিও সামিরুল ইসলাম, এমআর গ্রুপ অফ এডুকেশনের ডিরেক্টর ড. জাহিদুল সরকার প্রমুখ।

এ দিন শাইখ হাফিজ ক্বারী মাওলানা আফজাল হোসেন মণ্ডলের তেলাওয়াতে কালাম পাকের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। মিশনের মূল ফটকের সামনে প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক মরহুম সিরাজুল ইসলামের নামাঙ্কিত স্মৃতি ফলকের আবরণ উন্মোচন করেন বিশেষ অতিথি শাইখ মাওলানা হুজাইফা গোলাম মুহাম্মদ বস্তানভী সহ বিশিষ্টজনেরা। এ ছাড়াও 'হৃদয়ের আলো' নামে মিশনের পত্রিকার ২য় সংখ্যা প্রকাশিত হয়। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন শিক্ষক রতন বসু। অনুষ্ঠান শেষ হয় রহমতে আলম মিশনের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর সহধর্মিণী মরহুমা জাহানারা বেগমের মাগফিরাত কামনায় আখেরি মোনাজাতের মাধ্যমে।