পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: ১৯৬৬ সালে আন্তোনিও রাত্তিন, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো মারাদোনা, ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহ্যাম। বিশ্বফুটবলে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড মুখোমুখি হলেই এই কিংবদন্তিদের নামগুলি স্মৃতির পাতা থেকে ভেসে ওঠে। এই ম্যাচগুলিও ফুটবলের ইতিহাসে কিংবদন্তি হয়ে আছে। বৃহস্পতিবারে আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। এবার বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। এই প্রথম শেষ চারে মুখোমুখি দুই দল, যেখানে রবিবারের ফাইনালে একটা কাঙ্ক্ষিত স্থান পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
২০ বছর পর ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপ। মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আজতেকায় আবার বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি দুই দল। তার ঠিক আগে ১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের দ্বীপপুঞ্জ ফকল্যান্ডস দুই দেশের মধ্যে সংঘাত। যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন সেনা ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ যোদ্ধা নিহত হন। ২ বছর পর বিশ্বকাপে সেই যুদ্ধের আবেগ তীব্র। সেই ম্যাচেই দিয়েগো মারাদোনার সেই বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোল।

মারাদোনা আর্জেন্টাইনের কাছে এটা প্রতারণা ছিল না। এটা ছিল অভিজাতদের ওপর দুর্বলের বিজয়।
ওই ম্যাচ সম্পর্কে মারাদোনা তাঁর আত্মজীবনী ‘এল দিয়েগো’-তে লিখেছেন, ‘একটা ফুটবল দলকে হারানোর চেয়েও বড় ছিল একটা দেশকে হারানো। মালভিনাস যুদ্ধের সঙ্গে ফুটবলের কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমরা জানতাম, সেখানে অনেক আর্জেন্টাইন শিশু মারা গিয়েছিল, ছোট পাখির মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে। এটাই ছিল প্রতিশোধ।’ ১৯৮৬ সালের পর দুই দেশের বিশ্বকাপে সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯৯৮ সালের শেষ ষোলোর ম্যাচে। ওই ম্যাচে লালকার্ড দেখেছিলেন ডেভিড বেকহ্যাম, যা স্মরণীয় হয়ে আছে। টাইব্রেকারে ম্যাচ জিতেছিল আর্জেন্টিনা। ৪ বছর পর গ্রুপ পর্বে বেকহ্যামেরই গোলে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে জিতেছিল ইংল্যান্ড। বিশ্বকাপে সেটাই ছিল দুই দেশের শেষ সাক্ষাৎ।
ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে সম্পর্ক দীর্ঘকাল ধরেই উত্তাল।
তার প্রভাব পড়েছে মাঠেও। ‘আলবিসেলেস্তে’দের দেখলেই যেন ঘৃণা জন্মে ওঠে ‘থ্রি লায়ন্স’-এর মধ্যে। দুই দেশের মধ্যেই আবার সেই বহু প্রতীক্ষিত লড়াই। বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক নতুন অধ্যায় রচিত হতে চলেছে, যেখানে ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার লড়াই হবে। টমাস টুখেলের রক্ষণাত্মক ও সেটপিস নির্ভর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন এবং লিওনেল মেসির বিদায়ী সংগীত, যা যেন কিছুতেই শেষ হতে চাইছে না।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে অবশ্য অ্যার্জেন্টিনার কাজটা সহজ হবে না। ‘থ্রি লায়ন্স’-এর রক্ষণভাগ যথেষ্ট শক্তিশালী। টুর্নামেন্টের এতটা গভীরে এসে ইংল্যান্ডের ক্লান্তি এবং ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে, কিন্তু আর্জেন্টিনা মূলত লিওনেল মেসির ওপর নির্ভরশীল। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা সম্পূর্ণ ফিট ও সেরা দল মাঠে নামাতে পেরেছে, যা বরাবরের মতোই লিওনেল মেসিকে কেন্দ্র করে গঠিত। পিছন থেকে সাহায্য করছেন জুলিয়ান আলভারেজ। লিয়ান্দ্রো পারেদেস রক্ষণভাগের সামলে দলকে দারুণ নির্ভরতা দিয়েছেন। রড্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্ডেজ ও অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের অভিজ্ঞতা মাঝমাঠকে বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে।
গোলকিপার এমিলিয়ানো মার্টিনেজ বড় ম্যাচ এবং পেনাল্টি শুটআউটে সেই ঐতিহ্য নিয়ে এসেছেন, যা অতীতে তাদের রক্ষা করেছে।
লিওনেল স্কালোনির দলের মূল বৈশিষ্ট্য হল মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণ করা, বিপজ্জনক জায়গায় মেসিকে বল দেওয়া। বিপক্ষের আক্রমণের সময় নিজেদের রক্ষণে সংখ্যা বাড়াতেই সিদ্ধহস্ত। মেসিকে খুব একটা গতিতে খেলতে দেখা যায় না, কিন্তু ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করতে ওস্তাদ। যে কোনও রক্ষণের কাছে তিনি ত্রাস। আগের ম্যাচেই সুইৎজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর পাস থেকেই এসেছিল গোল। সুতরাং তাঁকে নিয়ে সতর্ক না থাকলে সমস্যায় পড়তে হবে ইংল্যান্ডকে।
আর্জেন্টিনার সবকিছুই নির্ভর করছে লিওনেল মেসির রক্ষণভাগের ফাঁকে জায়গা খুঁজে নেওয়ার ওপর। জন স্টোনস, মার্ক গেহি এবং ডেক্লান রাইসকে মেসির তৈরি করা ফাঁকা জায়গাগুলো সামলাতে হবে, যাতে পিছনে জুলিয়ান আলভারেজ কোনও সুযোগ না পান। মেসিকে জায়গা দিলে তিনিই ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবেন। আর্জেন্টিনা মাঝমাঠে খেলা নিয়ন্ত্রণ করতে চাইবে, যেখানে লিয়ান্দ্রো পারেদেস, রড্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্ডেজ এবং অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ভারসাম্য এনে দিয়েছেন। দুই লাইনের মাঝে লিওনেল মেসির কাছে বল পৌঁছে দেওয়াই মূল লক্ষ্য থাকবে আর্জেন্টিনার। মেসির কোনও মুহূর্ত বা জুলিয়ান আলভারেজের একটা দৌড় ম্যাচের নিষ্পত্তি করে দিতে পারে। আর্জেন্টিনার লক্ষ্যে থাকবে ইংল্যান্ডের গতি কমিয়ে সুযোগ বুঝে আক্রমণে যাওয়া। যদি আর্জেন্টিনার খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করে ইংল্যান্ডকে পেছনে ঠেলে দিতে পারে, তাদের হাতেই থাকবে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ।