পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: কলকাতার সল্টলেক বনবিতানে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ২০২৬ সালের অরণ্য সপ্তাহের সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ দিন উদ্বোধনী মঞ্চ থেকে তিনি একদিকে যেমন সবুজায়নের কড়া বার্তা দিলেন, তেমনই পূর্বতন সরকারের বিরুদ্ধে বন দফতরকে চরম অবহেলার অভিযোগ তুললেন। পাশাপাশি, রাজ্যের প্রতিটি জনপ্রতিনিধিকে নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছ লাগানোর বড়সড় লক্ষ্যমাত্রাও বেঁধে দিলেন তিনি।
প্রচার ট্যাবলো উদ্বোধন এবং পড়ুয়াদের হাতে চারাগাছ তুলে দিয়ে এই অরণ্য সপ্তাহের সূচনা করেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে রাজ্যের বর্তমান পরিবেশ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ পায়। আকাশপথে রাজ্য পরিদর্শনের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, জঙ্গলমহল থেকে উত্তরবঙ্গ;সর্বত্রই অরণ্য ধ্বংসের করুণ ছবি চোখে পড়ে। এই প্রসঙ্গে পূর্বতন সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বিগত ১৫ বছরের সরকার ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টকে অবহেলা করেছে। বরাদ্দ দেয়নি, ম্যানপাওয়ার দেয়নি, পরিকাঠামো দেয়নি।

’ ওড়িশা ও ছত্তিশগড়ের মতো পড়শি রাজ্যগুলি থেকে শিক্ষা নিয়ে ডবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে বন দফতরকে আরও শক্তিশালী করার নির্দেশ দেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর মতে, রাজ্যজুড়ে এখন কেবলই কংক্রিটের জঙ্গল। নিয়ম অনুযায়ী যে কোনও পরিকাঠামো বা বিল্ডিং তৈরির সময় এক-তৃতীয়াংশ জমিতে গাছ লাগানোর কথা থাকলেও, বাস্তবে তা কেউ মানছে না। অরণ্যসুন্দরী ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া থেকে শুরু করে হাসিমারা, চালসা বা জলদাপাড়ার মতো এলাকায় গত দশ বছরে ব্যাপক হারে জঙ্গল ধ্বংস হয়েছে বলে তিনি আক্ষেপ করেন।
পরিবেশের এই ভারসাম্য ফেরাতে ব্যাপক বনসৃজনের ডাক দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। চলতি বছরে রাজ্যে ৭ কোটি ২০ লক্ষ গাছ লাগানোর বড় লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার। গত ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসে ৭ লক্ষ গাছ লাগানোর লক্ষ্যের বিপরীতে একদিনেই ৯ লক্ষের বেশি চারা পোঁতা হয়েছে। রথযাত্রার সেবা ক্যাম্পগুলি থেকে ফলের গাছ এবং বজ্রপাত রুখতে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের মাধ্যমে নারকেল গাছ বিতরণের অভিনব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি, আইওসি-র মতো বাণিজ্যিক সংস্থাগুলিও এই বছর রাজ্যে ১০ লক্ষ গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে শুধু গাছ লাগালেই হবে না, অন্তত দু’বছর তার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের উপর জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। নিজের পুরানো অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে তিনি বলেন, হাজার গাছ লাগালে তিন বছর পর অর্ধেক গাছ বাঁচে। তাই শুধু ছবি তোলায় সীমাবদ্ধ না থেকে নিয়মিত তদারকির দায়িত্ব নিতে হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর বিপুল পরিমাণ গাছ লাগানোর উদাহরণ টেনে তিনি রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, ‘উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যদি বলতে পারেন আমি এই বর্ষে ২৬ কোটি গাছ লাগাব, আমরা পশ্চিমবঙ্গ উত্তরপ্রদেশের মতো অত বড় রাজ্য নই, আমরাও কেন বলতে পারব না আমরাও ১০ কোটি গাছ এই বর্ষে লাগাব?’ তিনি আরও বলেন, পঞ্চায়েত সদস্য, বিধায়ক থেকে সাংসদ;সকলকেই সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এই কাজে এগিয়ে আসতে হবে।
বন দফতরকে পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কাঠ মাফিয়াদের বিরুদ্ধে পুলিশের সাহায্য নিয়ে কড়া পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘গাছ চুরি, গাছ পাচার, বেআইনি কাঠের মিল;আমরা যেমন পশ্চিমবঙ্গে গরু পাচার বন্ধ করেছি, আমরা যেমন পশ্চিমবঙ্গে অনেক অবৈধ কাজ হত;সংগঠিত সিন্ডিকেট, রাস্তায় হাত পাতা, সব বন্ধ করেছি; আপনারাও গাছ পাচার রোখার জন্য পুলিশকে সাথে নিয়ে আপনারাও উদ্যোগ গ্রহণ করুন যাতে আমাদের গাছগুলিকে তার পূর্ণতা পাওয়ার আগে কেউ কেটে ফেলতে না পারে, এ বিষয়েও আপনাদের যত্ন নিতে হবে।’
বনকর্মীদের অভাব-অভিযোগ নিয়েও এ দিন সরব হন মুখ্যমন্ত্রী। শূন্যপদ পূরণের আশ্বাস দিয়ে তিনি জানান, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পুলিশ রিত্রু«টমেন্ট বোর্ডের মাধ্যমেই বন দফতরে নিয়োগ হবে। কর্মক্ষেত্রে মৃত বনকর্মীদের আটকে থাকা ফাইলগুলি দ্রুত ছাড়ার জন্য মুখ্যসচিবকে নির্দেশ দেন তিনি। হাতি ও মানুষের সংঘাত রুখতেও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
এ দিনের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের বনমন্ত্রী মনোজ ওঁরাও, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, বন দফতরের রাষ্ট্রমন্ত্রী দিবাকর ঘরামি, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল সহ অন্যান্য পদস্থ আধিকারিকরা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘মায়ের নামে একটি গাছ’ কর্মসূচির প্রশংসা করার পাশাপাশি, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহানের প্রতিদিন নিয়ম করে গাছ লাগানোর অভ্যাসের কথা উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী সকলকে পরিবেশ রক্ষায় ব্রতী হওয়ার আহ্বান জানান। সব মিলিয়ে, অরণ্য সপ্তাহের সূচনায় মুখ্যমন্ত্রীর এই কড়া ও সুনির্দিষ্ট বার্তায় রাজ্যজুড়ে নতুন করে সবুজায়নের আশা দেখছেন পরিবেশপ্রেমীরা।