পুবের কলম ওয়েব ডেস্ক: ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে পৌঁছে রূপকথার জন্ম দিয়েছিল আফ্রিকান ফুটবলের সিংহ মরক্কো। এবার সেই ইতিহাস স্পর্শ করার সামনে মহম্মদ ওয়াহাবির দল। কানাডাকে ৩,০ ব্যবধানে উড়িয়ে পৌঁছে গেল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে। জোড়া গোল করে নায়ক আজ্জেদিন উনাহি। কাতার বিশ্বকাপে মরক্কোর কাছে হেরে বিদায়
নেওয়ার পর, স্পেনের কোচ উনাহি সম্পর্কে বলেছিলেন, এই ছেলেটা কোথা থেকে এসেছে! উনাহির খেলা দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন লুইস এনরিকে। উনাহি আজ আর বিস্ময় নন, কানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, দলকে টেনে নিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে।
ম্যাচের ২১ মিনিটে দলের সেরা স্ট্রাইকার ইসমাইল সাইবারি যখন হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে মাঠ ছেড়েছিলেন, মরোক্কানরা হয়তো আশঙ্কার ছায়া দেখছিলেন। সাইবারির অভাব বুঝতেই দিলেন না লুইস এনরিকের সেই ‘বিস্ময়কর ফুটবলার’। যদি ম্যাচের প্রথমার্ধ দেখে মনে হয়নি এই ম্যাচে নায়ক হতে পারেন উনাহি। শুরু থেকেই কানাডার দাপট। ১০ মিনিটেই কানাডার সামনে গোলের সুযোগ এসে গিয়েছিল। জোনাথান ডেভিডের শট বাঁ পা বাড়িয়ে দুর্দান্তভাবে ব্লক করেন মরক্কো গোলকিপার ইয়াসিন বুনু।
২১ মিনিটেই বড় ধাক্কা খায় মরক্কো। হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় দলের সেরা স্ট্রাইকার ইসমাইল সাইবারিকে।
প্রথমার্ধে মরক্কোকে দেখে একটু অবাকই হতে হল। জার্সি দেখে চিনতে হচ্ছিল আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজদের। আসলে শুরু থেকেই কানাডার প্রেসিং ফুটবল অবাক করে দিয়েছিল মরক্কোকে। ধাতস্থ হয়ে ম্যাচে ফিরতে যথেষ্ট সময় লেগেছিল মহম্মদ ওয়াহাবির দলের। মরক্কোর রক্ষণভাগের উপর বারবার চাপ সৃষ্টি করছিল কানাডা। আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজদের বিন্দুমাত্র জায়গা দিচ্ছিলেন না কানাডা ফুটবলারা। বল ধরলেই রীতিমতো তাড়া করে বল ছিনিয়ে প্রতি আক্রমণে উঠে আসার চেষ্টা করছিল কানাডা। প্রথমার্ধে কোন দল গোল করতে না পারলেও ম্যাচ যথেষ্ট উত্তেজক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। প্ৰথমার্ধে কানাডার গোল লক্ষ্য করে মাত্র একটাই শট নিতে পেরেছিল মরক্কো। ফিফটি-ফিফটি বলেরও দখল নিতে পারেননি মরক্কো ফুটবলাররা। অসংখ্য ভুল পাসও সমস্যায় ফেলেছিল মরক্কোকে। প্রথমার্ধে মরক্কোর বলের দখল বেশি থাকলেও কানাডাই বেশি গোল লক্ষ্য করে শট নিয়েছিল। ৫৬ শতাংশ বলের দখল রেখেও কানাডার গোল লক্ষ্য করে মাত্র একটা শর্ট রাখতে পেরেছিল মরক্কো।
দ্বিতীয়ার্ধের সম্পূর্ণ অন্য মরক্কো। প্রথম ম্যাচে ব্রাজিলের বিরুদ্ধে যে ফুটবল উপহার দিয়েছিল, দ্বিতীয়ার্ধে কানাডার বিরুদ্ধে সেই মরক্কোকে দেখা গেল। একের পর এক আক্রমণ তুলে নিয়ে আসতে থাকেন উনাহি, ব্রাহিম দিয়াজরা। অবশেষে ৫০ মিনিটে এগিয়ে যায় মরক্কো। কানাডার বক্সের বাঁদিকে ফ্রিকিক পেয়েছিল। আশরাফ হাকিমি বল না ভাসিয়ে বুদ্ধি করে বক্সের বাইরে কাট ব্যাক রেখেছিলেন। চলন্ত বলে ডানপায়ের গড়ানো শট নিয়েছিলেন আজ্জেদিন উনাহি। একাধিক ফুটবলারের পায়ের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে বল জালে জড়িয়ে যায়।
পিছিয়ে পড়ে আক্রমণে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করে কানাডা। কিন্তু মিনিট পাঁচেক পর আবার ম্যাচের রাশ নিজেদের হাতে তুলে নেয় মরক্কো। একের পর এক আক্রমণ তুলে নিয়ে আসছিলেন আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিম দিয়াজ, উনাহিরা। ৭৬ মিনিটে প্রতি আক্রমণে কানাডার সামনে একটা গোলের সুযোগ এসে গিয়েছিল। মরক্কো গোলকিপার ইয়াসিন বুনু দারুণ তৎপরতার সঙ্গে সেই প্রয়াস রুখে দেন। পরক্ষণেই ডি বক্সের মধ্যে ফ্রিকিক পায় কানাডা। জোনাথন ডেভিডের শট বারের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যায়। ৭৯ মিনিটে কানাডার তাজন বুচানন বক্সের বাইরে থেকে দুরন্ত শট নিয়েছিলেন। বল গোলে ঢোকার মুখে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দারুণ তৎপরতার সঙ্গে কর্নারের বিনিময়ে বাঁচান ইয়াসিন বুনু।
৮২ মিনিটে প্রতি আক্রমণে উঠে এসে দ্বিতীয় গোল তুলে নেয় মরক্কো। বাঁদিক থেকে দুরন্ত গতিতে উঠে এসে কানাডার বক্সের মধ্যে ব্রাহিম দিয়াজকে বল বাড়িয়ে ছিলেন হালাল। দিয়াজ পাস বাড়ান উনাহিকে। তার ডান পায়ের জুড়ালো শর্ট আবার কাঁপিয়ে দেয় কানাডার জাল একইসঙ্গে প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় মরক্কোর কোয়ার্টার ফাইনাল। ৮৫ মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ এসেছিল মরক্কোর সামনে। ডান দিক থেকে দুরন্ত গতিতে উঠে এসে বক্সের মধ্যে সেন্টার করেছিলেন উনাহি। সুফিয়ান রাহিমির হেড বারে লেগে ফিরে আসে। ইনজুরি সময়ে অবশ্য আর হতাশ হতে হয়নি রাহিমিকে। একেবারে শেষলগ্নে সেই ব্রাহিম দিয়াজের মাপা পাস থেকে ৩-০ করেন রাহিমি। ম্যাচের স্কোর দেখলে মনে হতে পারে একতরফা লড়াই হয়েছে। আসলে তা নয়, কানাডাও যথেষ্ট ভাল ফুটবল খেলেছে। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাসে শুধু গোলটাই পায়নি। আর এখানেই বাজিমাত করে গেল অ্যাটলাস লায়ন্সরা।