ফ্রান্সের এভিয়ান-লে-বেঁস শহরে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বন্ধে জোরালো বার্তা দিলেন বিশ্বনেতারা। লেবাননে অবিলম্বে এবং কার্যকর যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান তারা। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক অন্তর্বর্তী সমঝোতা চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে এটিকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান ও লেবাননে কয়েক মাসের সংঘাতে সাত হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানির পর মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিতে জি৭ নেতারা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছেন। তারা মনে করছেন, ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতা অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা প্রশমনের পথ খুলে দিতে পারে।
হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্ব
চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। তবে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথ গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন জি৭ নেতারা।

সমঝোতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে উঠে এসেছে লেবাননের পরিস্থিতি। গত মার্চে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পর দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এর ফলে প্রায় ১০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
ইরান জানিয়েছে, স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য লেবানন থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধবিরতি অপরিহার্য। তবে ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহারে অনড় অবস্থান বজায় রেখেছে।

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মধ্যে মতপার্থক্যও প্রকাশ্যে এসেছে। জি৭ সম্মেলনে ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন।

শীর্ষ সম্মেলনের আরেকটি প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল ইউক্রেন যুদ্ধ। জি৭ নেতারা ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ আরও বাড়াতে নতুন নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দেশটির জ্বালানি খাতকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে। পাশাপাশি ইউক্রেনকে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চীনের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ
ফ্রান্সের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এবারের সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদের সরবরাহ নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যহীনতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
বিরল খনিজের ক্ষেত্রে চীনের ওপর পশ্চিমা বিশ্বের অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে একটি যৌথ কৌশল গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

খনিজ প্রক্রিয়াকরণ ও পুনর্ব্যবহার সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

সম্মেলনের ফাঁকে ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোকেই আরও বেশি দায়িত্ব নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর ওপর জোর দেন তিনি।

তিনি বলেন, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইউরোপীয় দেশগুলোর আরও বড় ভূমিকা নেওয়াই যৌক্তিক এবং সময়ের দাবি।
উল্লেখ্য, জি৭ জোটের সদস্য দেশগুলো হলো—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি ও জাপান। এবারের সম্মেলনে মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি, ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্গঠনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।।