ফের মহাকাশ গবেষণায় বড় সাফল্য ভারতের। দেশের প্রথম জিও-অরবিট ইমেজিং স্যাটেলাইট EOS-05-এর সফল উৎক্ষেপণ করল ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো। শুক্রবার ভোররাত ২টা ৫৫ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান স্পেস সেন্টারের দ্বিতীয় লঞ্চ প্যাড থেকে GSLV-F17 রকেটের মাধ্যমে উপগ্রহটিকে মহাকাশে পাঠানো হয়। উৎক্ষেপণের পর নির্ধারিত প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার উচ্চতার জিওস্টেশনারি কক্ষপথে নিখুঁতভাবে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে ২,৩৬৭ কেজি ওজনের এই উপগ্রহকে।

ইসরোর এই সাফল্যকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, জিও-অরবিটে স্থাপন করা উপগ্রহগুলির মধ্যে EOS-05-ই ভারতের সবচেয়ে ভারী উপগ্রহ।

যদিও এর আগে আরও ভারী উপগ্রহ মহাকাশে পাঠিয়েছে ইসরো। তাদের শক্তিশালী LVM-3 রকেটের মাধ্যমে ৪,৪১০ কেজি ওজনের যোগাযোগ উপগ্রহ CMS-03 এবং ৬,১০০ কেজি ওজনের বেসরকারি উপগ্রহ BlueBird Block-2 মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল।

ইসরোর এক সিনিয়র বিজ্ঞানী EOS-05-কে ‘আকাশে ভারতের চোখ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এই উপগ্রহ থেকে পাওয়া ছবি ও তথ্য আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নজরদারি-সহ একাধিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রায় নয় বছর ধরে পরিষেবা দেওয়ার জন্য তৈরি এই উপগ্রহের মাধ্যমে ভারতের ভূপৃষ্ঠ ও পরিবেশ সম্পর্কে দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়ার পথ আরও প্রশস্ত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

EOS-05 নিয়ে অবশ্য উৎক্ষেপণের আগে থেকেই নানা জল্পনা ছিল।

বিভিন্ন মহলে দাবি উঠেছিল, এটি নাকি একটি গুপ্তচর উপগ্রহ। যদিও সেই দাবি সরাসরি খারিজ করেছে ইসরো। সংস্থার বক্তব্য, বর্তমানে লো-আর্থ অরবিটে থাকা উপগ্রহগুলির মাধ্যমেও আবহাওয়া, কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং সীমান্ত সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু কক্ষপথগত অবস্থানের কারণে সেগুলি সব সময় ভারতীয় উপমহাদেশের উপর থেকে রিয়েল-টাইম তথ্য দিতে পারে না। জিওস্টেশনারি কক্ষপথে অবস্থান করায় EOS-05 সেই ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা আরও বাড়াবে।

সফল উৎক্ষেপণের পর ইসরোর চেয়ারম্যান ভি. নারায়ণন জানান, এটি শ্রীহরিকোটা থেকে ইসরোর ১০৭তম উৎক্ষেপণ এবং GSLV-এর ১৯তম মিশন।

চলতি আর্থিক বছরে এটি ইসরোর প্রথম সফল অভিযান। তাঁর কথায়, চলতি বছরে আরও ছয়টি মহাকাশ অভিযানের পরিকল্পনা রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিশন গগনযান।

এই সাফল্য ইসরোর জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে সাম্প্রতিক কয়েকটি চ্যালেঞ্জের কারণে। ২০২১ সালে GSLV-F10 রকেটের মাধ্যমে EOS-03 উপগ্রহ উৎক্ষেপণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। এরপর চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি PSLV-C62 রকেটের মাধ্যমে ১৬টি উপগ্রহকে কক্ষপথে পাঠানোর অভিযানও সফল হয়নি। পরপর ব্যর্থতার সেই ধাক্কা কাটিয়ে EOS-05-এর সফল উৎক্ষেপণ ইসরোর বিজ্ঞানী ও ইঞ্জিনিয়ারদের আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বাড়াবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে ইসরোর বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ কয়েক বছরের কঠোর পরিশ্রম। পাঁচ-ছয় বছর ধরে পরিকল্পনা, পরীক্ষা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির পর অবশেষে ভোররাতে সাফল্যের মুখ দেখল সেই অভিযান। আর এই সাফল্যের হাত ধরেই মহাকাশ থেকে ভারতকে আরও দ্রুত, নির্ভুল ও বিস্তৃত তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল।