হিমবাহ ধসে ভয়াবহ বন্যার পর নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলিতে নেমে এসেছে অকল্পনীয় মানবিক বিপর্যয়। কোথাও বুকভাঙা কান্না, কোথাও আবার শেষবারের মতো প্রিয়জনের নিথর দেহটি ছুঁয়ে দেখার আকুতি। ত্রিশূলী নদীর তীরে ৭০ বছরের দিল বাহাদুর শ্রেষ্ঠার করুণ দৃশ্য সেই বিপর্যয়েরই প্রতিচ্ছবি। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে খালি হাতে মাটি খুঁড়ে স্ত্রী যমুনা শ্রেষ্ঠার দেহ খুঁজছেন তিনি। কিন্তু উদ্ধারকাজের জন্য সামান্য একটি কোদালও তাঁর কাছে নেই।

গত ২৬ আগস্ট হিমবাহ ধসের জেরে রুদ্রমূর্তি ধারণ করে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী। সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে শুরু হওয়া ভয়াবহ প্লাবন মাত্র ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ করে দেয়। নেপাল ও তিব্বত সীমান্ত মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ইতিমধ্যেই ১,২৭৩ ছাড়িয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় পৌনে পাঁচ হাজার মানুষ, যাঁদের মধ্যে বহু বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন।

সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলির চিত্র ভয়াবহ।

একসময় ব্যস্ত বাজার যেখানে মানুষের ভিড়ে গমগম করত, সেখানে এখন কয়েক ফুট পুরু কাদার স্তর। কোথাও ছয়তলা ভবনের মাত্র দু’টি তলা দেখা যাচ্ছে, কোথাও আবার বাস, দোকানপাট ও পিচঢালা রাস্তার কোনও চিহ্নই নেই। প্রবল স্রোতে নদী নিজের গতিপথ বদলে নিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের হারিয়ে যাওয়া জীবনের শেষ স্মৃতি—শিশুদের খেলনা, ভাঙা চশমা, রান্নার বাসন।

বিপর্যয়ে বহু পরিবার একসঙ্গে একাধিক স্বজনকে হারিয়েছে।

৫৭ বছরের শান্তমায়া লাওয়াত মাত্র ১০ মাস আগে জীবনের সমস্ত সঞ্চয় দিয়ে নতুন বাড়ি তৈরি করেছিলেন। ২০১৫ সালের ভূমিকম্পেও বেঁচে যাওয়া তাঁর পরিবার এবার হারিয়েছে পাঁচ সদস্যকে। নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর আক্ষেপ, ‘‘আমার স্বর্গটা এক মুহূর্তে নরক হয়ে গেল।’’

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। বহু রাস্তা ধ্বংস হওয়ায় বিচ্ছিন্ন গ্রামগুলিতে পৌঁছনো প্রায় অসম্ভব। পরিস্থিতি মোকাবিলায় হেলিকপ্টারের পাশাপাশি কার্গো ড্রোন ও শেরপাদের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় খাদ্য ও ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। জাতিসংঘও সতর্ক করেছে, দ্রুত ত্রাণ না পৌঁছালে দুর্গম এলাকাগুলিতে মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।