নেপালে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পর পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও নিখোঁজ বহু মানুষ। দুর্গম ও বিপর্যস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছে সেনাবাহিনী, উদ্ধারকারী দল এবং বিভিন্ন সংস্থা। একাধিক সুড়ঙ্গে নিখোঁজদের সন্ধান চালানো হলেও এখনও বহু মানুষের কোনও হদিস মেলেনি। এমনকি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি সুড়ঙ্গে থার্মাল ড্রোন পাঠিয়েও নিখোঁজ ৯৩ শ্রমিকের সন্ধান পাওয়া যায়নি।

হড়পা বান আসার সময় রাসুয়া জেলার রাসুয়াগাধি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন অন্তত ৯৩ জন শ্রমিক। বিপর্যয়ের পর থেকে তাঁদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করা যায়নি। সুড়ঙ্গের কোথায় তাঁরা আটকে থাকতে পারেন, তা জানতে নেপালি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে অনুসন্ধান চালানো হয়। উদ্ধারকাজে যুক্ত করা হয় ইঞ্জিনিয়ারদেরও।

ভোটেকোশী নদীর বানের জেরে সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষে ঢাকা পড়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল উদ্ধারকারীদের। কিন্তু শ্রমিকদের অবস্থান নির্দিষ্ট করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সোমবার সুড়ঙ্গের ভিতরে থার্মাল ড্রোন পাঠানো হয়। ড্রোনটি সুড়ঙ্গের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পৌঁছলেও কোনও মানুষের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সচিবালয় জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বাধীন উদ্ধারকারী দল অনুসন্ধান চালিয়ে ফিরে এসেছে।

ড্রোনের মাধ্যমে কোনও শ্রমিকের সন্ধান না পাওয়ার পর ওই সুড়ঙ্গে তল্লাশি অভিযান আপাতত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ৯৩ জন শ্রমিক কি আদৌ জীবিত আছেন?

তাঁদের মৃত্যু হয়ে থাকলে দেহগুলি কোথায়? তাঁরা কি বরফ, কাদা ও ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে রয়েছেন, নাকি কোনও ভাবে সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন? এই প্রশ্নগুলির কোনও নিশ্চিত উত্তর এখনও মেলেনি।

ত্রিশূলী নদীর উপর রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলা মিলিয়ে মোট ন’টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি এখনও নির্মীয়মাণ। ভয়াবহ হড়পা বানের জেরে একাধিক প্রকল্পের সুড়ঙ্গের মুখ কাদা ও ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে যায়। বিপর্যয়ের সময় সেখানে বহু শ্রমিক কাজ করছিলেন। তাঁদের কয়েক জনকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও অনেকের কোনও সন্ধান মেলেনি।

এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় নেপাল সরকার বিপর্যয়ের সর্বশেষ পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখনও পর্যন্ত ৯৩৯ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। রবিবার পর্যন্ত নিখোঁজের সংখ্যা ছিল প্রায় আড়াই হাজার। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৯২৫। জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ১১ হাজার ৩৭৯ জনকে।

নিখোঁজদের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকও রয়েছেন। সোমবার রাতে ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়েছে, এখনও পর্যন্ত ১৫৮ জন ভারতীয়কে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে আড়াইশোরও বেশি ভারতীয়ের সঙ্গে এখনও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। নিখোঁজদের তালিকায় ভারতীয় বংশোদ্ভূতরাও রয়েছেন।

নেপালের এই বিপর্যয়ে পশ্চিমবঙ্গের ৩৯ জন পর্যটকও আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু’জনকে ইতিমধ্যে রাজ্যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৩৭ জনের এখনও কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি। রবিবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছিলেন, বসিরহাটের ওই দু’জন বাড়িতে ফিরে এসেছেন। নিখোঁজদের বিষয়ে নতুন কোনও তথ্য পাওয়া গিয়েছে কি না, সোমবার রাত পর্যন্ত রাজ্য সরকারের তরফে তা জানানো হয়নি। ভবানী ভবনে কন্ট্রোলরুম চালু রয়েছে।

অন্য দিকে, উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় নেপালের হাসপাতালগুলির মর্গেও চাপ বাড়ছে। বহু জায়গায় অস্থায়ী মর্গ তৈরি করা হয়েছে। পরিজনদের খোঁজে হাসপাতাল ও মর্গগুলির বাইরে ভিড় করছেন বহু মানুষ। পচন ধরতে শুরু করা দেহগুলির পরিচয় শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

দাবিদারহীন মৃতদেহের সংখ্যা বেড়ে গেলে কীভাবে সেগুলি সংরক্ষণ ও সমাধিস্থ করা হবে, সে বিষয়ে নেপাল সরকার নির্দেশিকা জারি করেছে। নিরাপত্তাবাহিনী ও জেলা প্রশাসনকে মৃতদেহের সমস্ত তথ্য ও নথি সংরক্ষণ করে সমাধিস্থ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অশনাক্ত দেহগুলির ডিএনএ নমুনাও সংগ্রহ করা হচ্ছে।

এই কাজে নেপাল সরকারকে সাহায্য করতে ভারত থেকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের একটি দল পাঠানো হয়েছে।

বুধবার নেপালের সীমান্তবর্তী তিব্বতেও ভয়াবহ হড়পা বান ও বন্যার তাণ্ডব দেখা যায়। চিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতে এই বিপর্যয়ে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৭ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৪৯ জন ভারতীয় রয়েছেন বলে জানিয়েছে বেজিং। তামিলনাড়ুর একটি ভ্রমণ সংস্থা জানিয়েছে, তাদের ৪৯ জনের একটি পর্যটকদল কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিল। বিপর্যয়ের পর থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

তবে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মধ্যেও মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন পশ্চিমবঙ্গের হুগলির উত্তরপাড়ার অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষিকা অঞ্জনা সান্যাল। একটি পর্যটন সংস্থার সঙ্গে তিনি কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন। গত ২৬ তারিখ কাঠমান্ডু থেকে বাসে করে চিনের অভিবাসন দফতরের দিকে যাওয়ার সময় তাঁদের বাস মাঝপথে থামে। যাত্রীরা চা খেতে ও শৌচাগারে যাওয়ার জন্য নেমেছিলেন।

প্রায় ১০ মিনিট পর বাসটি ফের যাত্রা শুরু করে। তার আগেই চালক হড়পা বানের খবর পেয়ে যান। ঝুঁকি না নিয়ে তিনি বাস ঘুরিয়ে কাঠমান্ডুর দিকে ফিরে আসেন। পাঁচ দিন পর উত্তরপাড়ার বাড়িতে ফেরেন অঞ্জনা। ভয়াবহ সেই অভিজ্ঞতা এখনও তাঁকে তাড়া করছে। তবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার কৈলাস দর্শনে যাওয়ার ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।