অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সংসারে ছিল আর্থিক অনটন, অনিশ্চয়তা আর প্রতিদিনের লড়াই। তবুও স্বপ্ন দেখা থামায়নি নূর আফসা। কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় আর অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সঙ্গী করে এবার মাধ্যমিকে স্কুলের ইতিহাসে রেকর্ড গড়ল জগৎবল্লভপুরের এই কিশোরী। হাওড়ার জগৎবল্লভপুরের পোলগুস্তিয়ার রবীন্দ্র বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী নূর আফসা এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় পেয়েছে ৬৮০ নম্বর। স্কুলের ইতিহাসে এর আগে কোনও ছাত্রী এত নম্বর পায়নি। ফলে নূরের এই সাফল্যে আজ আনন্দে ভাসছে শুধু তার পরিবার নয়, গোটা স্কুল এবং গ্রামের মানুষও।
নূরের বাবা নূর আলম মল্লিক একজন সাধারণ জরিশিল্পী। অল্প আয়ে কোনওরকমে সংসার চালান তিনি। মা সাহিদা মল্লিক গৃহবধূ। সংসারে অভাব থাকলেও মেয়ের পড়াশোনার ক্ষেত্রে কোনওদিন বাধা হয়ে দাঁড়াননি তাঁরা।

বরং নিজেদের সমস্ত কষ্ট চাপা দিয়ে মেয়ের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখেছেন দু’জনে।

গ্রামের মানুষ বলছেন, তাঁদের এলাকায় এর আগে কেউ এত ভালো ফল করেনি। বিশেষ করে নূরের বিষয়ভিত্তিক নম্বর শুনে অনেকেই বিস্মিত। ভৌত বিজ্ঞানে সে পেয়েছে পূর্ণ ১০০ নম্বর। জীবন বিজ্ঞানে ৯৯, ভূগোলে ৯৮, ইতিহাসে ৯৮, অঙ্কে ৯৬, ইংরেজিতে ৯৬ এবং বাংলায় ৯৩ নম্বর পেয়েছে সে। ফল প্রকাশের পর থেকেই পোলগুস্তিয়ার বাড়িতে শুভেচ্ছা জানাতে ভিড় জমাতে শুরু করেন প্রতিবেশীরা।

মা সাহিদা মল্লিক আবেগঘন গলায় বলেন, “রেজাল্টের খবর শোনার পর চোখে জল এসে গিয়েছিল। ছোট থেকেই ও খুব মন দিয়ে পড়াশোনা করে। প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে। ভালো ফল করবে জানতাম, কিন্তু এতটা ভালো করবে ভাবিনি।”
স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা রমিতা বসুও নূরকে নিয়ে গর্ব প্রকাশ করেছেন।

তাঁর কথায়, “নূর অত্যন্ত ভদ্র, শান্ত এবং নিয়মিত ছাত্রী। প্রায় কোনওদিন স্কুল কামাই করেনি। ক্লাসে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করত। ওর মধ্যে শেখার আগ্রহ সবসময় দেখা যেত। নূরের মতো ছাত্রী আমাদের স্কুলের গর্ব।”
নিজের সাফল্যের কৃতিত্ব অবশ্য পরিবার এবং শিক্ষকদেরই দিয়েছে নূর। সে জানায়, “বাবা-মা অনেক কষ্ট করেও আমার পড়াশোনার জন্য সবসময় পাশে থেকেছেন। স্কুলের শিক্ষকরাও আমাকে খুব সাহায্য করেছেন। তাঁদের জন্যই আজ এই ফল করতে পেরেছি।”
তবে শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করাই নয়, নূরের রয়েছে বড় স্বপ্নও। ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চায় সে।
কারণ নিজের গ্রামের মানুষের চিকিৎসার সমস্যাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে নূর। তার ইচ্ছে, পড়াশোনা শেষ করে আবার নিজের গ্রামেই ফিরে আসবে এবং গরিব ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে একজন চিকিৎসক হিসেবে।
কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থাভাব। উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে চিন্তায় পরিবার। তবুও মেয়ের স্বপ্ন ভাঙতে দিতে নারাজ বাবা-মা। মা সাহিদা বলেন, “যে কোনও মূল্যে মেয়েকে পড়াব। দরকার হলে আমরা নিজেরা না খেয়ে থাকব, তবুও ওর পড়াশোনা বন্ধ হতে দেব না। নূর যত দূর পড়তে চায়, আমরা ওকে তত দূরই পড়াব।”

এত বড় সাফল্যের পরেও এখনও পর্যন্ত সরকারি স্তরে কোনও সাহায্য মেলেনি বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তবে গ্রামের মানুষ এবং স্কুলের শিক্ষকরা আশা করছেন, নূরের মতো মেধাবী ছাত্রীর পাশে নিশ্চয়ই প্রশাসন এগিয়ে আসবে।
দারিদ্র্যকে হারিয়ে নূর আফসার এই সাফল্য আজ শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, বরং সংগ্রাম, স্বপ্ন আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।