পুবের কলম ওয়েবডেস্ক, হাসপাতালের সাদা দেওয়ালের অন্তরালে ধর্মের সমস্ত বিভাজন যেন বিলীন হয়ে যায়। সেখানে রোগীর নামের আগে ধর্ম, রাজ্য কিংবা ভাষা নয়—প্রথম পরিচয়, তিনি একজন মানুষ। দিল্লিতে সদ্য সম্পন্ন হওয়া এক নজিরবিহীন কিডনি প্রতিস্থাপন সেই মানবিক সত্যকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এল। চার রাজ্যের চারটি পরিবার, যাদের কেউ কাউকে আগে চিনতেন না, একটি বিশেষ কম্পিউটার সফটওয়্যারের সাহায্যে এমন এক দাতা-গ্রহীতা শৃঙ্খলে যুক্ত হলেন, যার পরিণতিতে একই দিনে চারজন রোগী নতুন জীবন পেলেন।

ঘটনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ সরাসরি নিজের পরিবারের সদস্যের কাছ থেকে কিডনি পাওয়ার পথ এই চার রোগীর কারও জন্যই খোলা ছিল না। কোথাও রক্তের গ্রুপ মেলেনি, আবার কোথাও শরীরে তৈরি হওয়া অ্যান্টিবডি সরাসরি প্রতিস্থাপনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। শেষ পর্যন্ত পেয়ার্ড কিডনি এক্সচেঞ্জ-এর পথেই খুলল সেই বন্ধ দরজা। আর গোটা জটিল প্রক্রিয়ায় সঠিক মিল খুঁজে বার করার কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিল অ্যালায়েন্স ফর পেয়ার্ড কিডনি ডোনেশন বা এপিকেডি-র ম্যাচিং সফটওয়্যার।

এই বিনিময় প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলেন নাগাল্যান্ডের ৩৪ বছরের ত্সুত্সাংলা পোনগেন, জম্মু ও কাশ্মীরের ৪৭ বছরের আবদুল রউফ ভাট, দিল্লির ৪৬ বছরের শিবানি খুরানা এবং বিহারের ৩৪ বছরের লাল বাহাদুর।

প্রত্যেকেরই কিডনি প্রতিস্থাপন প্রয়োজন ছিল এবং তাদের পরিবারে এমন একজন করে স্বেচ্ছাদাতা ছিলেন, যিনি প্রিয়জনকে অঙ্গ দান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিলতা সেই আবেগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নাগাল্যান্ডের ত্সুত্সাংলার প্রয়োজন ছিল দ্বিতীয়বার কিডনি প্রতিস্থাপনের। তাঁর ভাই এরিকোকবা পোনগেন কিডনি দিতে প্রস্তুত থাকলেও ত্সুত্সাংলার শরীরে তাঁর বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি হওয়ায় সরাসরি প্রতিস্থাপন সম্ভব ছিল না। জম্মু ও কাশ্মীরের আবদুল রউফ ভাটের ক্ষেত্রেও সমস্যা ছিল রোগপ্রতিরোধ-সংক্রান্ত অসামঞ্জস্য। তাঁর বোন নাজনীন রহমান ভাট কিডনি দান করতে চাইলেও তাঁদের মধ্যে প্রয়োজনীয় ইমিউনোলজিক্যাল সামঞ্জস্য ছিল না। দিল্লির শিবানি খুরানার ক্ষেত্রে তাঁর স্বামী বরুণ খুরানা দাতা হতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু গর্ভধারণ ও অতীতে রক্ত সঞ্চালনের পর শিবানির শরীরে এমন অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছিল, যা স্বামীর কিডনি গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে বিহারের লাল বাহাদুরের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী নিধি কুমারীর রক্তের গ্রুপের অসামঞ্জস্য ছিল।

কিন্তু সফটওয়্যার খুঁজে দিল অসম্ভবের মধ্যে সম্ভব মিল। রক্তের গ্রুপ, এইচএলএ টাইপিং, ক্রস-ম্যাচ এবং বিভিন্ন ইমিউনোলজিক্যাল পরীক্ষার তথ্য নিয়ে সফটওয়্যারটি চারটি দাতা-গ্রহীতা জুটির মধ্যে এমন একটি চক্র তৈরি করে, যেখানে একজনের দাতা অন্য পরিবারের রোগীর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে চূড়ান্ত বিন্যাসটি দাঁড়ায় এই রকম—দিল্লির বরুণ খুরানা কিডনি দেন নাগাল্যান্ডের ত্সুত্সাংলা পোনগেনকে। নাগাল্যান্ডের এরিকোকবা পোনগেন কিডনি দেন বিহারের লাল বাহাদুরকে। বিহারের নিধি কুমারী কিডনি দেন জম্মু ও কাশ্মীরের আবদুল রউফ ভাটকে। আর জম্মু ও কাশ্মীরের নাজনীন রহমান ভাট কিডনি দেন দিল্লির শিবানি খুরানাকে। অর্থাৎ যে দাতা নিজের প্রিয়জনকে সরাসরি অঙ্গ দিতে পারছিলেন না, তিনিই শেষ পর্যন্ত অন্য এক অপরিচিত মানুষের জীবন বাঁচালেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের এই সাফল্যের পিছনে ছিল দীর্ঘ আইনি ও প্রশাসনিক লড়াই। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত দিল্লি হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।

২৬ মে ২০২৬-এর রায়ে আদালত চার-পক্ষীয় কিডনি প্রতিস্থাপন বিনিময়ের পথ পরিষ্কার করে। আদালত মনে করে, আইনের অত্যন্ত সংকীর্ণ ব্যাখ্যা জীবনদায়ী প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করতে পারে। এরপর শুরু হয় চূড়ান্ত চিকিৎসাগত প্রস্তুতি। ১৩ জুলাই ২০২৬, দক্ষিণ দিল্লির সাকেতের ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে শুরু হয় সেই বহু প্রতীক্ষিত অস্ত্রোপচার। পাঁচটি অপারেশন থিয়েটারে একই সময়ে চলে মোট আটটি অস্ত্রোপচার। প্রায় সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ শেষ হয় এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া। পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক চিকিৎসক দিনেশ খুল্লার, অধ্যাপক চিকিৎসক অনন্ত কুমার এবং বিএলকে ম্যাক্স হাসপাতালের সিনিয়র চিকিৎসক শফিক আহমেদ ও তাঁর দল। হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের পর চারজন দাতা এবং চারজন গ্রহীতার শারীরিক অবস্থা সন্তোষজনক ছিল এবং পরবর্তী পর্যায়ে তাঁদের হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তির অঙ্কে এভাবেই খুলল মানবিকতার দরজা।