ইরানের সঙ্গে ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধের কোন স্পষ্ট অবসানের পথ না থাকায়, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি পরিচিত হাতিয়ারের শরণাপন্ন হয়েছেন: তেল অবরোধ।
এর লক্ষ্য হল ইরানকে বিশ্ব বাণিজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করা, যার ফলে দেশটি অত্যাবশ্যকীয় আমদানির পাশাপাশি তার সরকারের নির্ভরশীল তেল রপ্তানি রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হবে। প্রশাসন সম্প্রতি ভেনিজুয়েলা ও কিউবার বিরুদ্ধেও একই ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে।সোমবার হরমুজ প্রণালীতে কার্যকর হওয়া এই অবরোধটি শুধু ইরানের জন্যই নয়, বরং বিশ্ব অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহের জন্যও, অন্তত স্বল্প মেয়াদে, উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি বয়ে এনেছে। এমনকি বিশ্বের শীর্ষ তেল উৎপাদক দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও এটি সত্য, কারণ আমেরিকান ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের অনেক পণ্যের জন্য প্রচলিত বৈশ্বিক মূল্যই পরিশোধ করতে হয়।
ইরান দেখিয়েছে যে, এই অঞ্চলে জাহাজ হামলা চালাতে তারা ইচ্ছুক ও সক্ষম এবং সোমবার পারস্য উপসাগর জুড়ে পুনরায় হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে। এর ফলে অবকাঠামো মেরামত এবং তেল উৎপাদনকে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ে ফিরিয়ে আনা আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
“ভেনেজুয়েলার চেয়ে ইরানকে অবরোধ করা অনেক বেশি কঠিন কাজ বলে প্রমাণিত হতে পারে,” রবিবার আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বিশ্লেষকরা লিখেছেন, “এবং আমরা আশঙ্কা করছি যে তেহরান আঞ্চলিক জ্বালানি স্থাপনাগুলোর ওপর হামলা বাড়াবে।”
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল সোমবার বলেছেন, পারস্য উপসাগরের ৮০টিরও বেশি জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, এই অঞ্চলের উৎপাদন পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। (সাধারণত, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল এবং বিপুল পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল করে। এটি ইরানের দক্ষিণে অবস্থিত একটি জলপথ, যা দেশটি হামলার হুমকি দিয়ে বেশিরভাগ জাহাজের চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে।)
“আমাদের এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি পথ খুঁজে বের করতে হবে,” বলেছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ক্লেটন সিগল, যিনি ইরানের তেল অবরোধের ধারণাকে সমর্থন করেছেন। “ইরান যদি তার তেল রপ্তানি করতে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই অর্থ গ্রহণ করতে না পারে, তবে দেশটি চাপের মুখে পড়বে।”
মার্কিন অবরোধ এবং ইরানের সঙ্গে ভঙ্গুর দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ওপর এর প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ও কোথায় ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোকে আটকানোর চেষ্টা করতে পারে, সেই বিবরণসহ বিস্তারিত তথ্যই এই অভিযানটি কতটা কঠিন হবে তা নির্ধারণ করবে। এই প্রচেষ্টা মার্কিন মিত্রদের কাছ থেকে সামান্যই সমর্থন পেয়েছে।
তেল ব্যবসায়ীরা সপ্তাহান্তে অবরোধ এবং ব্যর্থ শান্তি আলোচনার খবরকে মূলত উপেক্ষা করেছেন। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি ছিল, যা আলোচনা শুরুর আগের দামের চেয়ে সামান্য বেশি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সেই ধরনের জ্বালানি ঘাটতির সম্মুখীন হচ্ছে না, যেগুলোর মোকাবিলা অন্যান্য অনেক দেশ করছে। কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যখন যুদ্ধ শুরু করেছিল, তখনকার তুলনায় গ্যাসোলিন, ডিজেল এবং জেট ফুয়েলের দাম এখন অনেক বেশি।
এর কারণ হল, তেল এবং তা থেকে তৈরি জ্বালানি বিশ্ব বাজারে লেনদেন হয়, তাই কোথাও সরবরাহ কমে গেলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দেশগুলো নতুন সরবরাহকারী খুঁজতে শুরু করলে সব জায়গায় দাম বেড়ে যাবে। এমনকি ট্রাম্পও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন বলে মনে হচ্ছে যে, শিগগিরই পাম্পে তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমার সম্ভাবনা নেই।
প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজার ভিন্ন, কারণ এই বর্ণহীন জ্বালানি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো কঠিন। ঘর গরম করতে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধের শুরুর সময়ের চেয়েও সস্তা। এর বিপরীতে, এশিয়া ও ইউরোপে গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে, কারণ এই দেশগুলো প্রচুর পরিমাণে জ্বালানি আমদানি করে।
বিরোল বলেছেন ,“সবাই প্রভাবিত হবে, তবে কেউ কেউ অন্যদের তুলনায় কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে,”
ওয়াশিংটনের কট্টরপন্থী ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অফ ডেমোক্রেসিস’-এর সিনিয়র ফেলো মিয়াদ মালেকি অনুমান করেছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করতে সফল হয়, তবে দুই সপ্তাহ বা তারও বেশি সময়ের মধ্যে দেশটির তেল মজুত করার ক্ষমতা ফুরিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর ফলে শুধু রাজস্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসের পথই বন্ধ হবে না, বরং ইরানও তেল কূপগুলো বন্ধ করতে বাধ্য হবে, যেমনটা উপসাগরীয় অঞ্চলের তার প্রতিবেশী দেশগুলোকে করতে হয়েছে।
“ইরানি শাসকগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ানোর জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্পের কথা আমি ভাবতে পারি না,” বলেছেন মালেকি, একজন ইরান বিশেষজ্ঞ যিনি পূর্বে ট্রাম্প ও বাইডেন প্রশাসনের অধীনে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিষেধাজ্ঞা নীতি নিয়ে কাজ করেছেন।