উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : বৃহস্পতিবার দুপুরে ফের ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে উঠলো দক্ষিণ ২৪ পরগনার চম্পাহাটি-পিয়ালি এলাকা। পিয়ালি গ্রাম ও হালাল বাজি বাজারের মাঝামাঝি জলাজমির পাশে থাকা একটি বাজি কারখানায় আচমকাই বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে কারখানার ভিতরে।কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় গোটা এলাকা। বিস্ফোরণের ঘটনায় অন্তত পাঁচজন শ্রমিক দগ্ধ হয়েছেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে খবর।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বৃহস্পতিবার দুপুরে আচমকাই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শুনতে পান এলাকার বাসিন্দারা। শব্দ শুনে তাঁরা ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে গেলে দেখতে পান, বাজি কারখানার ভিতরে দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে।

চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। পরিস্থিতি দেখে দ্রুত খবর দেওয়া হয় বারুইপুর থানায় এবং দমকল বিভাগে।খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বারুইপুর থানার পুলিশ ও দমকলের কর্মীরা। শুরু হয় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার কাজ। আগুন নেভানোর পর কারখানার ভিতর থেকে দগ্ধ অবস্থায় পাঁচজনকে উদ্ধার করা হয় বলে জানা গিয়েছে। আহতদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে একজনের শারীরিক পরিস্থিতি গুরুতর হওয়ায় তাঁকে কলকাতার একটি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে খবর।তবে কীভাবে এই বিস্ফোরণ ঘটল, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

 বাজি তৈরির সময় কোনও রাসায়নিক পদার্থের বিক্রিয়া থেকে বিস্ফোরণ, নাকি অন্য কোনও কারণে আগুনের সূত্রপাত—তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ ও দমকল।ঘটনার পরেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে কারখানাটির বৈধতা নিয়ে। কারখানাটির প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও সরকারি অনুমোদন ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।নিয়ম মেনেকারখানাটি পরিচালিত হচ্ছিল, নাকি বেআইনিভাবে বাজি তৈরি চলছিল—তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।পুলিশ সূত্রে জানা গেল,   কারখানাটির মালিক কে, বিস্ফোরণের সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন কি না এবং কারখানায় কী ধরনের বাজি বা বিস্ফোরক সামগ্রী মজুত ছিল, সেই সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি আহত শ্রমিকদের বক্তব্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

চম্পাহাটি দীর্ঘদিন ধরেই বাজি শিল্পের জন্য পরিচিত। এই এলাকায় বহু ছোট-বড় বাজি কারখানা ও বাজি তৈরির সঙ্গে যুক্ত কর্মী রয়েছেন।

তবে অতীতে বেআইনি বাজি কারখানায় বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের একাধিক ঘটনায় প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসনের তরফে বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে বেআইনি বাজি উদ্ধার ও কারখানা বন্ধ করার পদক্ষেপ করা হলেও, অভিযোগ রয়েছে—কিছু জায়গায় ফের বেআইনি ভাবে বাজি তৈরির কাজ শুরু হয়ে যায়।এদিনের বিস্ফোরণের পর ফের সামনে এসেছে সেই পুরনো প্রশ্ন—নিয়ম না মেনে বাজি তৈরির কারখানা কীভাবে চলছে? কারখানাগুলিতে অগ্নি নিরাপত্তার ব্যবস্থা রয়েছে কি না,শ্রমিকদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না, এবং বিস্ফোরক সামগ্রী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে সরকারি বিধি মানা হচ্ছে কি না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, নজরদারির অভাবেই কোনও কোনও এলাকায় বেআইনি বাজি তৈরির কারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। যদিও প্রশাসনের কোনও অংশের মদতের অভিযোগের সত্যতা এখনও প্রমাণিত নয়। এই অভিযোগেরও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে দাবি স্থানীয়দের।এখন পুলিশের তদন্তে স্পষ্ট হবে কারখানাটি বৈধ ছিল কি না, বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ কী এবং নিরাপত্তা বিধি আদৌ মানা হয়েছিল কি না।একই সঙ্গে আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা ও তাঁদের পরিবারের পাশে প্রশাসন কীভাবে দাঁড়ায়, সেদিকেও নজর রয়েছে।

চম্পাহাটির মতো বাজি-প্রবণ এলাকায় যাতে ফের এমন দুর্ঘটনা না ঘটে, তার জন্য বেআইনি কারখানা চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি বৈধ কারখানাগুলিতেও নিয়মিত নিরাপত্তা পরিদর্শনের দাবি উঠেছে। এদিনের বিস্ফোরণ ফের একবার মনে করিয়ে দিল, সামান্য অসতর্কতাও বাজি তৈরির মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজে কতটা ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।