০৭ মার্চ ২০২৬, শনিবার, ২২ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কর্নাটকে এখনও চলছে দেবদাসী প্রথা, নিম্নবর্ণের মেয়েদের অবাধ যৌন-শোষণ

বিশেষ প্রতিবেদনঃ স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কর্নাটকের নানা প্রান্তে চলছে ‘দেবদাসীপ্রথা। সরকার আইন প্রণয়ন করেও উৎখাত করতে পারেনি এই বর্বর রীতিকে। হিন্দু সমাজে এই প্রথা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। ‘দেবদাসী’ করার প্রক্রিয়াটি হল, যখন কোনও মেয়ে কিশোরিবেলায় পৌঁছয় তখন তাকে দেবতার প্রতি উৎসর্গ করা হয়। দেবতার কাছে একবার নিবেদিত হলে সেই কন্যা সারাজীবনে আর কাউকে বিয়ে করতে পারবে না।

বছরের পর বছর ধরে নানা সংস্কার করে এই প্রথার বিলুপ্তি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তারপরও দেশের নানা এলাকায় হিন্দু নারীদের উপর ঘটে চলেছে এই অত্যাচার। এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে চলতি বছরের ফেব্র&য়ারি মাসে। এক ২২ বছরের তরুণী রুদ্রাম্মা (নাম পরিবর্তিত) দেবদাসী নির্মূলন কেন্দ্রের কাছে সাহায্য চান। যাতে তাঁকে দেবদাসী না করা হয়। দৈনিক ভাস্কর-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এরপর প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে ও এই তরুণীকে দেবদাসী হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। তাঁকে খুঁজতে পুলিশবাহিনী বিজয়নগর জেলায় কুডলিগি শহরে তাঁর বাড়িতে হাজির হয়। তখন রুদ্রাম্মা এক কারখানায় কাজের জন্য তাঁর মায়ের সঙ্গে বেরিয়েছিলেন। যাইহোক রুদ্রাম্মা বলেন, তিনি এই ভয়াবহ প্রথার হাত থেকে কোনও রকমে পালিয়ে বাঁচলেও তাঁর প্রেমিক তাঁকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেন। এখন তিনি একা থাকেন এবং কারখানায় কাজ করে পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন। তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের জীবনের কথা আমি কখনও কল্পনা করিনি। আমার নাচ ও নাটকে আগ্রহ ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে আমি নাম নথিভুক্ত করেছিলাম। সেখানে সবাই যখন জানতে পারল যে আমি দেবদাসী বকলমে যৌনকর্মী পরিবার থেকে এসেছি, তখন সেই প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের ছেলেরা আমাকে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করল। আমি সব কিছু হারালাম।

রুদ্রাম্মার মা জানান যে, বিয়ে করবে না বলে সংকল্প করেছে তাঁর কন্যা। এ দিকে রুদ্রাম্মা বলেন,  দেবদাসী হতে তাঁর মা ও পরিবার থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরে তাঁর মা লিখিতভাবে জানান যে, তিনি তাঁর মেয়েকে দেবদাসী প্রথার বলি হতে দেবেন না।

আসলে এই প্রথা চলে আসছে হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য মেনে। তাই  কুডলিগিতে যখন কোনও মেয়েকে দেবদাসী করা হয় তখন পুজো করা হয়। সেও সঙ্গে মারাম্মা মন্দিরের দেবদাসীরা নাচ ও গানের মাধ্যমে তাকে বরণ করে নেয়। মন্দিরে উৎসর্গ করার পর ও দেবতার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলে সেই কন্যা উচ্চবর্ণের পুরুষদের যৌনদাসীতে পরিণত হয়। গত কয়েক দশক আগে প্রশাসন এই প্রথাকে নিষিদ্ধ করে দিলেও অনেক মন্দিরে রমরম করে চলছে এই প্রথা। মন্দিরে পাঠানোর আগে রুদ্রাম্মাকে উদ্ধার করা হয়। সাংবাদিক কিরণ কুমার বলনাভারণ জানিয়েছেন, বিজয়নগরের হুদলিগে তালুকের ১২০টি গ্রামে প্রায় ৩ হাজার প্রাক্তন দেবদাসী বসবাস করেন। এই দেবদাসীদের ৯০ শতাংশই তপশিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের। ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের মেয়েদের দেবদাসী করা হয় না। কর্নাটক স্টেট মহিলা উন্নয়ন কর্পোরেশন ২০০৮ সালে একটি সমীক্ষা চালায়।

তা থেকে উঠে আসে, এই রাজ্যে দেবদাসীর সংখ্যা প্রায় ৪০৬০০ জন। ২০১৮ সালে এক আন্তর্জাতিক এনজিও সমীক্ষা চালিয়ে জানায়, কর্নাটকে ৯০ হাজার দেবদাসী রয়েছেন, যাদের ২০ শতাংশের বেশি উত্তর কর্নাটকের বাসিন্দা। এদের বয়স ১৮ বছরেরও কম।

সে যাইহোক, দেবদাসী প্রথা যে ভারতীয় সমাজের লজ্জা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সরকার কড়া আইন প্রণয়ন করলে এবং উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা সহযোগিতা করলে এই দেবদাসী বিলোপ করা অসম্ভব কিছু নয়।

হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা এই দেবদাসী প্রথা বিলোপের জন্য দলিত ও নিম্নবর্ণে লোকেরা বহু আন্দোলন করেছে। শেষপর্যন্ত কর্নাটক ও দাক্ষিণাত্যের আরও কয়েকটি রাজ্য এই দেবদাসী প্রথা আইনগতভাবে বিলোপ করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণের মেয়েদের শোষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই প্রথা রমরমিয়ে চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মন্দিরের প্রভাবশালী পুরোহিত, উচ্চবর্ণের ধনী ও পয়সাওয়ালা সম্প্রদায়। তারা দেবদাসীদের ধর্মের নামে নিজেদের ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করেছে। এ বিষয়ে কারও বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।

কারণ, প্রথা রয়েছে নিম্নবর্ণের কোনও কিশোরী মেয়েকে পিতা-মাতা কোনও মন্দিরে দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। এই উৎসর্গকরণকে ধরা হয় দেবতার সঙ্গে বিবাহ হিসেবে। আর অন্যকোনও পুরুষ এই মেয়েকে বিবাহ করতে পারে না। কিন্তু মন্দিরে পুরোহিত ও অন্য লোকেরা মেয়েটিকে ইচ্ছেমতো যৌন-সম্ভোগ করতে পারে।

এই প্রথার বলি হয়ে হাজার হাজার দেবদাসী স্বামী-পুত্র-সংসার বিহীন এক বেশ্যার জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। যার অসুস্থ অবস্থায় কিংবা বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনার কেউই থাকে না।

এবার কিন্তু জোর দাবি উঠেছে, দেবদাসীর মতো কুপ্রথাকে যে করে হোক উচ্ছেদ করতে হবে। সব থেকে আশ্চর্যের কথা, বজরং দল, হিন্দু যুবা বাহিনী দুর্গা বাহিনী কিংবা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অথবা রাষ্ট্র স্বয়ংসেবক সংঘ দেবদাসী প্রথা ও দেবদাসী মেয়েদের কখনোই দৃষ্টিপাত করে না। সমাজকে শুদ্ধ করার তাদের ভাবনাকে এসব ক্ষেত্রে তারা ‘তাকে তুলে রেখে দেয়। আর অব্যাহতভাবে চলতে থাকে তপশিলি জাতি ও উপজাতি মেয়েদের ধর্মের নামে যৌন শোষণ। কর্নাটক ও দাক্ষিণাত্যে কখন এই প্রথার অবসান ঘটবে, তা শুধু সময়ই বলতে পারে।

সর্বধিক পাঠিত

প্রতিবেশী দেশ থেকে হামলা না হলে আক্রমণ নয়: ইরানের প্রেসিডেন্ট

Copyright © Puber Kalom All rights reserved.| Developed by eTech Builder

কর্নাটকে এখনও চলছে দেবদাসী প্রথা, নিম্নবর্ণের মেয়েদের অবাধ যৌন-শোষণ

আপডেট : ২৬ অগাস্ট ২০২১, বৃহস্পতিবার

বিশেষ প্রতিবেদনঃ স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও কর্নাটকের নানা প্রান্তে চলছে ‘দেবদাসীপ্রথা। সরকার আইন প্রণয়ন করেও উৎখাত করতে পারেনি এই বর্বর রীতিকে। হিন্দু সমাজে এই প্রথা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে। ‘দেবদাসী’ করার প্রক্রিয়াটি হল, যখন কোনও মেয়ে কিশোরিবেলায় পৌঁছয় তখন তাকে দেবতার প্রতি উৎসর্গ করা হয়। দেবতার কাছে একবার নিবেদিত হলে সেই কন্যা সারাজীবনে আর কাউকে বিয়ে করতে পারবে না।

বছরের পর বছর ধরে নানা সংস্কার করে এই প্রথার বিলুপ্তি ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছে, কিন্তু তারপরও দেশের নানা এলাকায় হিন্দু নারীদের উপর ঘটে চলেছে এই অত্যাচার। এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে চলতি বছরের ফেব্র&য়ারি মাসে। এক ২২ বছরের তরুণী রুদ্রাম্মা (নাম পরিবর্তিত) দেবদাসী নির্মূলন কেন্দ্রের কাছে সাহায্য চান। যাতে তাঁকে দেবদাসী না করা হয়। দৈনিক ভাস্কর-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, এরপর প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে ও এই তরুণীকে দেবদাসী হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করে। তাঁকে খুঁজতে পুলিশবাহিনী বিজয়নগর জেলায় কুডলিগি শহরে তাঁর বাড়িতে হাজির হয়। তখন রুদ্রাম্মা এক কারখানায় কাজের জন্য তাঁর মায়ের সঙ্গে বেরিয়েছিলেন। যাইহোক রুদ্রাম্মা বলেন, তিনি এই ভয়াবহ প্রথার হাত থেকে কোনও রকমে পালিয়ে বাঁচলেও তাঁর প্রেমিক তাঁকে বিয়ে করতে অস্বীকার করেন। এখন তিনি একা থাকেন এবং কারখানায় কাজ করে পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেন। তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের জীবনের কথা আমি কখনও কল্পনা করিনি। আমার নাচ ও নাটকে আগ্রহ ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে আমি নাম নথিভুক্ত করেছিলাম। সেখানে সবাই যখন জানতে পারল যে আমি দেবদাসী বকলমে যৌনকর্মী পরিবার থেকে এসেছি, তখন সেই প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের ছেলেরা আমাকে উত্ত্যক্ত করতে শুরু করল। আমি সব কিছু হারালাম।

রুদ্রাম্মার মা জানান যে, বিয়ে করবে না বলে সংকল্প করেছে তাঁর কন্যা। এ দিকে রুদ্রাম্মা বলেন,  দেবদাসী হতে তাঁর মা ও পরিবার থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরে তাঁর মা লিখিতভাবে জানান যে, তিনি তাঁর মেয়েকে দেবদাসী প্রথার বলি হতে দেবেন না।

আসলে এই প্রথা চলে আসছে হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য মেনে। তাই  কুডলিগিতে যখন কোনও মেয়েকে দেবদাসী করা হয় তখন পুজো করা হয়। সেও সঙ্গে মারাম্মা মন্দিরের দেবদাসীরা নাচ ও গানের মাধ্যমে তাকে বরণ করে নেয়। মন্দিরে উৎসর্গ করার পর ও দেবতার সঙ্গে বিয়ে হয়ে গেলে সেই কন্যা উচ্চবর্ণের পুরুষদের যৌনদাসীতে পরিণত হয়। গত কয়েক দশক আগে প্রশাসন এই প্রথাকে নিষিদ্ধ করে দিলেও অনেক মন্দিরে রমরম করে চলছে এই প্রথা। মন্দিরে পাঠানোর আগে রুদ্রাম্মাকে উদ্ধার করা হয়। সাংবাদিক কিরণ কুমার বলনাভারণ জানিয়েছেন, বিজয়নগরের হুদলিগে তালুকের ১২০টি গ্রামে প্রায় ৩ হাজার প্রাক্তন দেবদাসী বসবাস করেন। এই দেবদাসীদের ৯০ শতাংশই তপশিলি উপজাতি সম্প্রদায়ের। ব্রাহ্মণ ও উচ্চবর্ণের মেয়েদের দেবদাসী করা হয় না। কর্নাটক স্টেট মহিলা উন্নয়ন কর্পোরেশন ২০০৮ সালে একটি সমীক্ষা চালায়।

তা থেকে উঠে আসে, এই রাজ্যে দেবদাসীর সংখ্যা প্রায় ৪০৬০০ জন। ২০১৮ সালে এক আন্তর্জাতিক এনজিও সমীক্ষা চালিয়ে জানায়, কর্নাটকে ৯০ হাজার দেবদাসী রয়েছেন, যাদের ২০ শতাংশের বেশি উত্তর কর্নাটকের বাসিন্দা। এদের বয়স ১৮ বছরেরও কম।

সে যাইহোক, দেবদাসী প্রথা যে ভারতীয় সমাজের লজ্জা, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সরকার কড়া আইন প্রণয়ন করলে এবং উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা সহযোগিতা করলে এই দেবদাসী বিলোপ করা অসম্ভব কিছু নয়।

হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা এই দেবদাসী প্রথা বিলোপের জন্য দলিত ও নিম্নবর্ণে লোকেরা বহু আন্দোলন করেছে। শেষপর্যন্ত কর্নাটক ও দাক্ষিণাত্যের আরও কয়েকটি রাজ্য এই দেবদাসী প্রথা আইনগতভাবে বিলোপ করতে সমর্থ হয়েছে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণের মেয়েদের শোষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এই প্রথা রমরমিয়ে চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মন্দিরের প্রভাবশালী পুরোহিত, উচ্চবর্ণের ধনী ও পয়সাওয়ালা সম্প্রদায়। তারা দেবদাসীদের ধর্মের নামে নিজেদের ভোগের সামগ্রীতে পরিণত করেছে। এ বিষয়ে কারও বাধা দেওয়ার অধিকার নেই।

কারণ, প্রথা রয়েছে নিম্নবর্ণের কোনও কিশোরী মেয়েকে পিতা-মাতা কোনও মন্দিরে দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। এই উৎসর্গকরণকে ধরা হয় দেবতার সঙ্গে বিবাহ হিসেবে। আর অন্যকোনও পুরুষ এই মেয়েকে বিবাহ করতে পারে না। কিন্তু মন্দিরে পুরোহিত ও অন্য লোকেরা মেয়েটিকে ইচ্ছেমতো যৌন-সম্ভোগ করতে পারে।

এই প্রথার বলি হয়ে হাজার হাজার দেবদাসী স্বামী-পুত্র-সংসার বিহীন এক বেশ্যার জীবনযাপন করতে বাধ্য হন। যার অসুস্থ অবস্থায় কিংবা বৃদ্ধ বয়সে দেখাশোনার কেউই থাকে না।

এবার কিন্তু জোর দাবি উঠেছে, দেবদাসীর মতো কুপ্রথাকে যে করে হোক উচ্ছেদ করতে হবে। সব থেকে আশ্চর্যের কথা, বজরং দল, হিন্দু যুবা বাহিনী দুর্গা বাহিনী কিংবা বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অথবা রাষ্ট্র স্বয়ংসেবক সংঘ দেবদাসী প্রথা ও দেবদাসী মেয়েদের কখনোই দৃষ্টিপাত করে না। সমাজকে শুদ্ধ করার তাদের ভাবনাকে এসব ক্ষেত্রে তারা ‘তাকে তুলে রেখে দেয়। আর অব্যাহতভাবে চলতে থাকে তপশিলি জাতি ও উপজাতি মেয়েদের ধর্মের নামে যৌন শোষণ। কর্নাটক ও দাক্ষিণাত্যে কখন এই প্রথার অবসান ঘটবে, তা শুধু সময়ই বলতে পারে।