আসলাম হোসেনঃ সংসদে তড়িঘড়ি মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ করানোর জন্য বিজেপি সরকার ৩ দিনের বিশেষ অধিবেশনের আহ্বান করেছিল। কিন্তু বিরোধীদের বক্তব্য হচ্ছে, মহিলা সংরক্ষণ নয়, বিজেপির আসল উদ্দেশ্য ছিল,  রাজ্যগুলির আসন সংখ্যা বৃদ্ধি। কিন্তু বিরোধী দলসমূহ ও দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির প্রবল চাপে বিলটি লোকসভায় দুই তৃতীয়াংশ সমর্থন হাসিল করতে পারেনি। ফলে বিলটি বাতিল হয়ে যায়। এই বিল নিয়ে লোকসভায় প্রিয়াঙ্কা গান্ধি যে বক্তব্য রাখেন। কী বলেছেন প্রিয়াঙ্কা? সেই বক্তব্য এখানে তুলে ধরা হল।

সংসদে নিজের ভাষণের শুরুতেই মহিলাদের জন্য সংরক্ষণের ইস্যুকে তার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন প্রিয়াঙ্কা। কীভাবে কংগ্রেস মহিলাদের সংরক্ষণের জন্য সক্রিয় হয়েছিল এবং কীভাবে এই সংরক্ষণ কার্যকর করার জন্য কংগ্রেস সরকারের আমলে প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল সবটাই তুলে ধরেন তিনি। সংসদের ভরা কক্ষে প্রিয়াঙ্কা বলেন, মহিলা সংরক্ষণের ঐতিহাসিক পটভূমিই হচ্ছে--- এর সূচনাও করেছিলেন ‘নেহরু’ নামের এক ব্যক্তি। তবে ভয় পাবেন না, এটি সেই নেহরু নন, যাঁকে নিয়ে আপনারা এতটা অস্বস্তিতে থাকেন। তিনি হলেন, তাঁর পিতা (জওহরলাল নেহরুর পিতা) মতিলাল নেহরু। মতিলাল নেহরু ১৯২৮ সালে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছিলেন এবং সেই প্রতিবেদনটি কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী কমিটির কাছে জমা দিয়েছিলেন। সেই প্রতিবেদনে তিনি ১৯টি মৌলিক অধিকারের তালিকা তৈরি করেছিলেন। ১৯৩১ সালে সর্দার প্যাটেলের সভাপতিত্বে করাচিতে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়েছিল। সেই করাচি অধিবেশনে এই প্রস্তাব পাস হয় এবং 

সেখান থেকেই দেশের রাজনীতিতে মহিলাদের সমান অধিকারের সূচনা হয়।

প্রিয়াঙ্কা জানান, সেই সময়ই ‘এক ভোট, এক নাগরিক, এক মূল্য’--- এই নীতিও দেশের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। আর এই প্রসঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে তুলনা টেনে প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘‘আমাদের দেশে মহিলারা স্বাধীনতার প্রথমদিন থেকেই ভোটাধিকার পেয়েছিলেন। অথচ আমেরিকার মতো দেশে এই অধিকার পেতে মহিলাদের ১৫০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে, সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মহিলা সংরক্ষণ চালু করাও বিশ্বের কাছে এক অনন্য পদক্ষেপ ছিল। পঞ্চায়েত ও পৌরসভায় ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের প্রস্তাবও কংগ্রেস সরকারই প্রথমবার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধির নেতৃত্বে সংসদে পেশ করেছিল। কিন্তু তখন সেই প্রস্তাব পাশ হয়নি।

এরপরেই এইনিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কটাক্ষ করেন প্রিয়াঙ্কা। প্রিয়াঙ্কা মনে করিয়ে দেন, সেই সময় এই বিল নিয়ে কংগ্রেসের তীব্র বিরোধিতা করেছিল বিজেপি। অথচ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সেকথা এখন এড়িয়ে গিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা তথ্য তুলে ধরে জানান, কংগ্রেসের পদক্ষেপের কারণেই আজ ৪০ লক্ষ পঞ্চায়েত প্রতিনিধির মধ্যে ১৫ লক্ষ মহিলা গণতন্ত্রের অংশীদার।  ২০১৮ সালে রাহুল গান্ধি প্রধানমন্ত্রী মোদিকে একটি চিঠি 

লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন যে, মহিলা সংরক্ষণ ২০১৯-এর মধ্যেই কার্যকর করা উচিত। আমার তো মনে হয়, প্রধানমন্ত্রী সংসদে এসে রাহুলকে নিয়ে হাসাহাসি করেন ঠিকই, কিন্তু বাড়ি গিয়ে তাঁর কথাগুলো নিয়ে ভাবেন। কারণ আজ আমরা সেই বিষয় নিয়েই  আলোচনা করছি।

এরপরেই মহিলা সংরক্ষণ বিলের আড়ালে বিজেপির আসল উদ্দেশ্য কি তা সামনে আনেন প্রিয়াঙ্কা। তিনি বলেন,  "সরকার যে বিলটি পেশ করেছে, তার খসড়া আমরা পড়েছি, আর তাতে পুরো আলোচনার দিকই বদলে গেছে।

প্রথমে বলা হয়েছে সংসদে মহিলা সংরক্ষণ ২০২৯ সালের মধ্যে কার্যকর হবে। আমরা একমত। তারপর বলা হয়েছে, এটি কার্যকর করতে লোকসভার সদস্যসংখ্যা ৫০ শতাংশ বাড়াতে হবে। অর্থাৎ ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করতে হবে।"

প্রিয়াঙ্কা জানান, এই আসন বৃদ্ধির জন্য একটি কমিশন গঠন করা হবে, যা ২০১১ সালের জনগণনাকে ভিত্তি করে কাজ করবে। উপরিভাগে এতে আপত্তিকর কিছু মনে না হলেও, গভীরে গেলে এর আসল উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়। এতে রাজনীতির বিষ মিশে আছে। কারণ ২০২৩ সালের যে বিল সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়েছিল, তাতে বলা ছিল, এটি কার্যকর করার আগে নতুন জনগণনা ও আসন পুনর্বিন্যাস করা হবে। প্রিয়াঙ্কার প্রশ্ন, এখন হঠাৎ কী বদলে গেল? সরকার কেন পুরনো তথ্যের ভিত্তিতে এগোতে চাইছে? এত তাড়াহুড়ো কেন?  বাস্তব সত্য হল--- প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন  জনসংখ্যার সঙ্গে জড়িত। প্রিয়াঙ্কার মতে, জাতিগত জনগণনা ছাড়া কোনও শ্রেণির সঠিক প্রতিনিধিত্ব সম্ভব নয়। বিজেপি সরকার ২০১১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে এগোতে চাইছে, কারণ সেই জনগণনায় ওবিসি শ্রেণির সংখ্যা নেই। আজ প্রধানমন্ত্রী হালকাভাবে বলেছেন, এইসব শ্রেণির (কাস্ট) বিষয়গুলি পরে দেখা হবে। কিন্তু এটি হালকাভাবে নেওয়ার বিষয় নয়।

এটি একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রশ্ন। তাদের পরিশ্রম, তাদের সংগ্রামের প্রশ্ন। ২০১১ সালের তথ্যের ভিত্তিতে আসন পুনর্বিন্যাস করলে ওবিসি শ্রেণির অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। এটি তাদের সঙ্গে বড় অন্যায়। তবে কংগ্রেস তা কখনও হতে দেবে না। প্রিয়াঙ্কার কথায়, ‘‘আমাদের সংবিধান সবার। এই দেশ প্রতিটি নাগরিকের। কারও অধিকার কেড়ে নিয়ে এটি চালানো যাবে না।’’  

অসমের তুলনা টেনে প্রিয়ঙ্কা বলেন, কীভাবে রাজ্যগুলির আসন গণতান্ত্রিক পদ্ধতিকে উপেক্ষা করে পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে বিজেপি। প্রিয়াঙ্কার কথায়, ‘‘প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রীরা আশ্বাস দিলেও নিশ্চিতভাবে বলা যায়, রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য বদলানো হবে। গণতন্ত্রে এত বড় পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। কিন্তু সরকারের পরিকল্পনা হলো সেই প্রক্রিয়াকেই উপেক্ষা করা। যেমন অসমে তারা নিজেদের সুবিধামতো আসন পুনর্বিন্যাস করেছে, বিরোধীদের আসন ভেঙেছে তেমনই সারা দেশে তা করতে চায়।’’ এই বিল নিয়ে প্রিয়াঙ্কার আশঙ্কা, সরকারের পছন্দের কয়েকজন ব্যক্তি পুরো দেশের রাজ্যগুলির অস্তিত্ব, গণতন্ত্রে তাদের ভূমিকা ও গুরুত্ব নির্ধারণ করবে। নির্বাচন কমিশন, বিচারব্যবস্থা, মিডিয়া সব কিছুর উপর চাপ সৃষ্টি করে গণতন্ত্রকে দুর্বল করার কাজ এই সরকার ইতিমধ্যেই শুরু করে দিয়েছে। আর এখন গণতন্ত্রের উপর সরাসরি আঘাত আসতে চলেছে। যদি এই বিল পাশ হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে এই দেশে গণতন্ত্র শেষ হয়ে গেছে।