ইসরায়েলের সাধারণ নির্বাচনে কোনও দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ফলে নতুন সরকার গঠন নিয়ে তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট—কেউই এককভাবে সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেননি। এই পরিস্থিতিতে কে প্রথম সরকার গঠনের সুযোগ পাবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে চলেছেন ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজাক হারজোগ।

প্রেসিডেন্ট হারজোগ জানিয়েছেন, আগামী রবিবার তিনি একজন প্রার্থীকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন। বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দলগুলির প্রধানদের সঙ্গে তাঁর পরামর্শপর্ব শেষ হয়েছে। সেখানে ১২০ সদস্যের নেসেটের মধ্যে ৬৭ জন আইনপ্রণেতা আইজেনকোটের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর পক্ষে রয়েছেন ৪৬ জন।

তবে এই সমর্থনের অঙ্কই সরকার গঠনের পথ সহজ করছে না। কারণ, আইজেনকোটের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ আইনপ্রণেতার সমর্থন এসেছে মূলত ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতিনিধিত্বকারী আরব দলগুলির কাছ থেকে। নির্বাচনে এই দলগুলি মোট ১৯টি আসন পেয়েছে।

কিন্তু আইজেনকোট আগেই জানিয়ে দিয়েছেন, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ না হলে আরব দলগুলিকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে তিনি রাজি নন।

অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোটের সমর্থন কমেছে তাঁর দীর্ঘদিনের মিত্র ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের অবস্থানের কারণে। অর্থোডক্স ইহুদিদের সামরিক পরিষেবা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে মতবিরোধের জেরে দলটি নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন স্থগিত রেখেছে। ফলে তাঁর ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোটের আসনসংখ্যা ৫৩ থেকে কমে ৪৬-এ দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় জোটের হাতে ৪৬টি আসন রয়েছে। আইজেনকোটকে সমর্থনকারী চারটি ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দলের আসন ৪৮টি। আর আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলির দখলে রয়েছে ১৯টি আসন। ফলে কোনও পক্ষের কাছেই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নেই।

আরব দলগুলির মধ্যে ইউনাইটেড আরব লিস্ট বা রাম এবং জয়েন্ট লিস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। রামের হাতে রয়েছে ৮টি এবং জয়েন্ট লিস্টের হাতে ১১টি আসন। রাম নেতা মনসুর আব্বাস আইজেনকোটের সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আগ্রহ দেখালেও জয়েন্ট লিস্ট সরকারে সরাসরি অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সমর্থন দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে।

তবে আরব দলগুলির সমর্থন পেতে আইজেনকোটকে কিছু শর্ত মানতে হবে। এর মধ্যে অন্যতম হল হামাসকে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া। রাম নেতা মনসুর আব্বাস হামাসকে নিরস্ত্র করার পক্ষে মত দিলেও সংগঠনটিকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করতে রাজি নন।

এদিকে, আইজেনকোটের পক্ষে সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে অতি-অর্থোডক্স দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ও শাসের সমর্থন। এই দুই দলের সমর্থন পেলে তাঁর পক্ষে ৬১ আসনের সমীকরণে পৌঁছনো সম্ভব। ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম সমর্থনের বিনিময়ে নির্দিষ্ট শর্তের কথা জানালেও শাস ইতিমধ্যেই নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছে।

প্রেসিডেন্ট হারজোগ অবশ্য এখনও প্রকাশ্যে কোনও পক্ষের প্রতি সমর্থন জানাননি। তাঁর বক্তব্য, সংখ্যার হিসাব স্পষ্ট মনে হলেও রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে পারস্পরিক বিরোধ এবং একে অপরকে সমর্থন না করার অবস্থানের কারণে সরকার গঠনের পথ এখনও অনিশ্চিত। নির্বাচনের আগেও নেতানিয়াহু ও আইজেনকোটের প্রধান দলগুলিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।

আরব দলগুলির প্রধান লক্ষ্য নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রত্যাবর্তন আটকানো। জয়েন্ট লিস্টের বক্তব্য, আইজেনকোটকে সমর্থন করার সিদ্ধান্তের পিছনে রয়েছে নেতানিয়াহু সরকারকে ক্ষমতায় ফিরে আসা থেকে আটকানোর জনদাবি।

বিনিময়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জন্য বাড়িঘর ধ্বংস বন্ধ করা, অপরাধ দমন এবং রাজনৈতিক সমাধানের একটি সুস্পষ্ট পথ তৈরির দাবি জানিয়েছে তারা।

জয়েন্ট লিস্টের জ্যেষ্ঠ নেতা আহমেদ তিবি বলেছেন, আইজেনকোটের সঙ্গে অংশীদারিত্ব প্রত্যাখ্যান করা হলে তা ইসরায়েলের রাজনৈতিক ব্যবস্থার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। তাঁর মতে, একটি 'মেরামত সরকার' গঠিত হলে যুদ্ধের অবসান না হলেও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের জীবনযাত্রার উন্নতি সম্ভব।

অন্যদিকে, রাম নেতা মনসুর আব্বাসও নেতানিয়াহুর পাশাপাশি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ এবং জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতমার বেন-গভীরের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার অবসানকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

ইসরায়েলের আইন অনুযায়ী, কোনও প্রার্থী ৬১টি আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলেও পার্লামেন্টের আস্থা ভোটে জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। সরকার গঠনের দায়িত্ব পাওয়া প্রথম প্রার্থীকে ২৮ দিন সময় দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আরও ১৪ দিন সময় বাড়ানো যেতে পারে। তিনি ব্যর্থ হলে দ্বিতীয় প্রার্থীকে সুযোগ দেওয়া হবে। দ্বিতীয় প্রার্থীও ব্যর্থ হলে নেসেট তৃতীয় কোনও প্রার্থীকে ১৪ দিনের জন্য সুযোগ দিতে পারে।

এরপরও সরকার গঠন সম্ভব না হলে পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হবে এবং ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সেই পরিস্থিতিতে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহুই অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

ইসরায়েলি বিষয়ক বিশ্লেষক নেহরু জামহুর আল জাজিরাকে বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অচলাবস্থা চলার সম্ভাবনা রয়েছে। তাঁর বিশ্লেষণ, পুনর্নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হলে বিরোধী শিবিরের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হতে পারে—এমন হিসাব থেকেই নেতানিয়াহু এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে চাইতে পারেন।