বিশেষ প্রতিবেদন:   মনুষ্যজাতি যতই আধুনিকতার পথে অগ্রসর হচ্ছে, ততই সভ্যতার নামে বৃক্ষ ছেদন থেকে শুরু করে পুকুর বুঝিয়ে, পাহাড় কেটে উঠছে বহুতল আবাসন। আধুনিক সুসজ্জিত সেই আবাসনে থাকতে গিয়ে মানবজাতি ক্রমশই মাটির সঙ্গে তার হৃদ্যতা হারিয়ে ফেলছে। প্রকৃতিকে তছনছ করার এক অদ্ভূত নেশায় মেতে উঠে নিজেকে সভ্য প্রমাণ করতে চাইছে আধুনিক সমাজ। বর্তমানে আমাদের সামনে সেই সভ্যতার ভয়ঙ্কর প্রমাণ মিলেছে যোশীমঠ বিপর্যয়ের মাধ্যমে।

যোশীমঠের মতোই সংকটে পড়তে চলেছে জম্মু-কাশ্মীর! অমরনাথ যাত্রাকে সুগম করতে পাহাড় কেটে নয়া রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের

ধীরে ধীরে পাহাড়ের কোলে থাকা এই পর্যটনপ্রিয় দেবভূমি যোশীমঠ মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে। ভূতত্ত্ববিদদের বিশ্লেষণ অনুসারে, যোশীমঠের অবস্থা ক্রমশই ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তবে এই পরিণতি একদিনে আসেনি। একটু একটু করে যোশীমঠের মাটি বসতে শুরু করেছে। আগামীদিনে যোশীমঠ বলে কিছু থাকবে কিনা তা এখন প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ভূতত্ত্ববিদদের কথায়, এই আতঙ্কের পূর্বাভাস আগেই দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে চলেছে নির্মাণ কাজ। তবে যোশীমঠের ঘটনার বহিঃপ্রকাশ পেয়েছে স্থানীয়দের বিক্ষোভে।

প্রায় আটশোর বেশি বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে। এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয়রা। শতাধিক বাড়ি বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। যোশীমঠের শঙ্করাচার্যের মঠের দেওয়ালেও ফাটল দেখা দিয়েছে।

ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা, 'ইসরো' যোশীমঠ কতখানি বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে, উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে সেই বার্তা তুলে ধরেছে। তবে শুধু যোশীমঠ নয়, নৈনিতাল, উত্তরকাশী আর চম্পাওয়াতও একই বিপদে রয়েছে। পর্যটনমুখী এই শহরগুলিতে ভিড় সামাল দিতে বেলাগাম গতিতে বেড়েছে হোটেল, রেস্তোরাঁ, হোমস্টে, ধর্মশালার সংখ্যা। ২০১৬ সালের একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, এই শহরগুলির ৫০ শতাংশ এলাকায় এখনও ভূমিধস হয়‌। অতিবৃষ্টি এই ভূমিধসের অন্যতম কারণ। ২০১০ সালের পর এই ভূমিধসের হার অনেকটাই বেড়ে গিয়েছে যোশীমঠের পাশাপাশি ডেঞ্জার জোনে রয়েছে দার্জিলিং। এই শৈলশহরকে পর্যটনমুখী করে তুলতে পাহাড় কেটে গড়ে উঠেছে শয়ে শয়ে আবাসন। গত কয়েক দশক ধরে চলা বেআইনি নির্মাণই সব চেয়ে বেশি দায়ী সেখানে।

স্বস্তিতে নেই কোলিয়াড়ি এলাকা রানিগঞ্জ। কয়লা তুলে নেওয়া হলেও, ঠিকঠাক স্যান্ড ফিলিং না করায়, ওপরের মাটি ধসে গিয়ে বারবার বিপত্তি ডেকে আনছে। সেই সঙ্গে রয়েছে কয়লা চুরির ফলে তৈরি হওয়া বিপদ! রানিগঞ্জের বহু বাড়িতে ফাটল দেখা দিয়েছে।

যোশীমঠের মতোই সংকটে পড়তে চলেছে জম্মু-কাশ্মীর! অমরনাথ যাত্রাকে সুগম করতে পাহাড় কেটে নয়া রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের

এই অবস্থার মধ্যে নিশ্চিন্তে থাকতে পারছে না কাশ্মীরবাসী। অমরনাথ যাত্রাকে কেন্দ্র করে তীর্থযাত্রীদের কথা কারুর অজানা নয়। এবার সেই অমরনাথ যাত্রাকে সুগম করে তুলতে ২২ কিলোমিটারের নতুন রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্র সরকার। সব ঋতুর উপযোগী করেই রাস্তাটি বানানোর পরিকল্পনা করেছে কেন্দ্রের সড়ক এবং পরিবহণ দফতর।

এই ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রস্তাবিত সড়কটি কাশ্মীরের চন্দনবাড়ি থেকে সঙ্গম পর্যন্ত যাবে। এই রাস্তার ১১ কিলোমিটার অংশ জুড়ে থাকবে একটি সুড়ঙ্গ, যেটি গণেশ টপ এলাকার নীচ দিয়ে যাবে। এই সড়ক প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় সরকার অর্থ যোগানের কাজ করলেও পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রযুক্তিগত সংস্থা থাকছে।

এই বিষয়ে ইচ্ছুক সংস্থাগুলির জন্য দরপত্র আহ্বান করবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক। এই দরপত্র জমা দেওয়ার দিন ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।

যোশীমঠের মতোই সংকটে পড়তে চলেছে জম্মু-কাশ্মীর! অমরনাথ যাত্রাকে সুগম করতে পাহাড় কেটে নয়া রাস্তা তৈরির সিদ্ধান্ত কেন্দ্রের

অমরনাথ গুহা জম্মু ও কাশ্মীরে অবস্থিত একটি হিন্দু তীর্থক্ষেত্র। এই গুহাটি সমতল থেকে ৩,৮৮৮ মিটার বা ১২,৭৫৬ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। শ্রীনগর থেকে ১৪১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই তীর্থে যেতে পহেলগাঁও শহর অতিক্রম করতে হয়। এই তীর্থ ক্ষেত্রটি হিন্দুদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং অন্যতম পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত হয়। প্রতি বছর জুলাই-অগস্ট মাসে উপত্যকায় বরফ সরাবার পর ভক্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয় অমরনাথ যাত্রা। কাশ্মীরের পহেলগাম থেকে এই তীর্থের দূরত্ব ৪০-৪৫ কিলোমিটার। বালতাল থেকে দূরত্ব ১৫ কিলোমিটার। কিন্তু বালতাল থেকে যে রাস্তা অমরনাথের দিকে গিয়েছে সেটি তুলনায় বেশি বিপজ্জনক। ভক্তরা প্রধানত পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় চড়ে অমরনাথ যাত্রায় শামিল হন। কিন্তু এই নতুন রাস্তাটি তৈরি হলে সড়কপথেই পৌঁছে যেতে পারবেন ভক্তরা। এমনকী জরুরি পরিষেবা দিতে দ্রুত সীমান্তবর্তী এলাকায় পৌঁছে যেতে পারবে সেনা। কিন্তু এখন প্রশ্ন উঠেছে মানুষের যাতায়াতের পথ সুগম করতে সেই আধুনিকতার পথেই ফের অগ্রসর হওয়া কতখানি যুক্তিযুক্ত! কারণ পাহাড় কেটেই তৈরি হবে সেই রাস্তা। প্রকৃতি সেই নির্মম হাতুড়ির ঘা কতটা সহ্য করতে পারবে সেটাই এখন প্রশ্ন হয়েছে দাঁড়িয়েছে! নাকি যোশীমঠের মতোই সংকট ধেয়ে আসবে জম্মু-কাশ্মীরে।