‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ বা যৌনতা মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে তুমুল সংঘর্ষে উত্তপ্ত হয়ে উঠল আর্মেনিয়ার পার্লামেন্ট। বিতর্ক চলাকালীন আইনপ্রণেতাদের মধ্যে শুরু হয় হাতাহাতি। একে অপরকে ঘুষি ও লাথি মারার পাশাপাশি ছোড়া হয় চেয়ার ও পানির বোতল। অধিবেশনকক্ষ থেকে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে পার্লামেন্ট ভবনের করিডোরেও। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয় নিরাপত্তাকর্মীদের।

ঘটনার সূত্রপাত বিরোধী দল স্ট্রং আর্মেনিয়া পার্টির একটি বিতর্কিত প্রস্তাবকে ঘিরে। দলটি জানিয়েছিল, নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে দেশে ‘কোনও অসন্তুষ্ট নারী থাকবে না’। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ‘সেক্স মন্ত্রণালয়’ গঠনের প্রস্তাব দেয় তারা। দলের যুক্তি ছিল, যৌন অসন্তুষ্টির কারণে মধ্যবয়সী শ্বেতাঙ্গ নারীদের মধ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা বাড়ছে। তবে এই প্রস্তাব ঘিরেই শেষ পর্যন্ত পার্লামেন্টে শুরু হয় তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত।

গত বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, প্রস্তাবটি নিয়ে বিতর্ক চলাকালীন ক্ষমতাসীন সিভিল কন্ট্রাক্ট পার্টির সংসদ সদস্য তারন চাখোয়ান বিরোধী দলকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলে আক্রমণ করেন। একই সঙ্গে প্রস্তাবের জন্য দলটির নেতা নারেক রাপেতিয়ানকে নারীদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। বিতর্কের একপর্যায়ে রাপেতিয়ানকে ‘আপাদমস্তক ঝামেলা’ বলে কটাক্ষ করেন চাখোয়ান। এরপরই দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় শুরু হয়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি হাতাহাতিতে গড়ায়। বিরোধী দলের কয়েকজন সংসদ সদস্য নিজেদের আসন ছেড়ে চাখোয়ানের বক্তব্য দেওয়ার ডায়াসের দিকে এগিয়ে যান। শুরু হয় কিল-ঘুষি ও লাথি বিনিময়। পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার তথা ক্ষমতাসীন দলের সদস্য ভাহাগন আলেকসানিয়ান বিরোধী আইনপ্রণেতাদের দিকে একটি চেয়ার ছুড়ে মারেন। অন্যদিকে, চাখোয়ানকে বিরোধী সদস্য গার্নিক দাভতিয়ানের দিকে পানি ছিটাতে দেখা যায়। ছোড়াছুড়ি চলে পানির বোতল নিয়েও।

সংঘর্ষের জেরে পার্লামেন্টের কয়েকটি টেবিল ভেঙে যায়।

প্রথমে স্পিকার অধিবেশন মুলতবি না করার সিদ্ধান্ত জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, সবাই যেন ঘটনাটি সরাসরি দেখতে পারেন। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত অধিবেশনে বিরতি ঘোষণা করতে হয়। তাতেও অবশ্য সংঘর্ষ থামেনি। পার্লামেন্টের করিডোরেও দুই পক্ষের সদস্যদের মধ্যে হাতাহাতি চলতে থাকে। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা দুই দলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানবপ্রাচীর তৈরি করেন। কয়েকজন সংসদ সদস্যকে আঘাতপ্রাপ্ত ও ছেঁড়া পোশাকে পার্লামেন্ট চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়।

ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান সহিংসতার নিন্দা করলেও ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যদের পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন জানান। তিনি বলেন, বিরোধী দলে থাকার অর্থ এই নয় যে কেউ উদ্ধত আচরণ করবেন।

চেয়ার ছোড়ার মতো ঘটনাও ঘটলেও ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা যা করেছেন, তা তাঁর মতে যথাযথ ছিল।

পরে ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে বিরোধী দল স্ট্রং আর্মেনিয়ার সংসদ সদস্যদের শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে কৌতুক করেন পাশিনিয়ান। পাল্টা মন্তব্যে চাখোয়ান দাবি করেন, বিরোধী সদস্যরাই প্রথমে লড়াই শুরু করে পরে পালিয়ে গিয়েছেন। তিনি তাঁদের আচরণকে ‘গুণ্ডামি’ বলেও আখ্যা দেন।

অন্যদিকে, বিরোধী নেতা কারাপেতিয়ান সংঘর্ষকে ‘আর্মেনীয় ধাঁচের পুরুষে পুরুষে স্বাভাবিক লড়াই’ বলে বর্ণনা করেন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের বিরক্ত করে আসা ব্যক্তিরা এবার সরাসরি জবাব পেয়েছেন।

এদিকে, সংঘর্ষের ঘটনায় কোনও ফৌজদারি মামলা বা আইনি পদক্ষেপ করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে আর্মেনিয়ার প্রসিকিউটর জেনারেলের কার্যালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের কাছে কোনও তথ্য নেই।

উল্লেখযোগ্যভাবে, একই দিনে আলবেনিয়ার পার্লামেন্টেও বিরোধী আইনপ্রণেতাদের বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। সেখানে স্মোক বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অধিবেশনের ডায়াস অবরুদ্ধ করেন বিরোধী সদস্যরা। বিতর্কিত একটি রিসোর্ট প্রকল্পকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ‘ফ্লেমিংগো আন্দোলন’ পরে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নেয়। সেন্ট্রাল ব্যাংক অব আলবেনিয়া-সংক্রান্ত একটি আইনের সংশোধনী নিয়ে ভোটাভুটির সময় ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট পার্টির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী এডি রামার পদত্যাগ দাবি করেন বিরোধী সদস্যরা।