উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : ভাদ্র মাস চলছে। সামনে শারদ উৎসব। তারই মধ্যে একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্বেগ বাড়ছে সুন্দরবনের মানুষের। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনা বেড়ে চলায় আতঙ্কিত গ্রামবাসীরা। এই পরিস্থিতিতে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে অভিনব উদ্যোগ নিলেন কুলতলির গ্রামের মহিলারা।গ্রামের রাস্তার দু’পাশে তালগাছ তৈরির লক্ষ্যে বসানো হচ্ছে তালের আঁটি।স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ইতিমধ্যেই এলাকায় প্রায় ১৫০০-র বেশি তালের আঁটি বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রামের বিভিন্ন পাড়ার রাস্তার দু’পাশে পর্যায়ক্রমে এই আঁটি বসানো হবে।

শুধু বসানোই নয়, ভবিষ্যতে চারাগুলির পরিচর্যা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন গ্রামের মহিলারা।গ্রামবাসীদের বক্তব্য, একসময় এই এলাকায় প্রচুর তালগাছ দেখা যেত।কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তালগাছের সংখ্যা কমে এসেছে।ফলে পরিবেশের পাশাপাশি হারিয়ে যাচ্ছে তালগাছকে ঘিরে থাকা গ্রামীণ অর্থনীতি ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই নতুন করে তালগাছের সংখ্যা বাড়ানোর ভাবনা থেকেই এই উদ্যোগ।স্থানীয় গ্রামবাসী পুলক মণ্ডল বলেন, “মহিলারা নিজেরাই এই কাজে এগিয়ে এসেছেন। গ্রামে তালগাছের সংখ্যা ক্রমশ কমছে। তালগাছ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বলে আমরা মনে করি।
তাই রাস্তার দু’পাশে বেশি করে তালগাছ তৈরি করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।” তালগাছকে ঘিরে রয়েছে গ্রামীণ জীবনের নানা অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও। এক গৃহবধূর কথায়, “তালের পাতা দিয়ে হাতপাখা, ঝুড়ি, চাটাই, মাদুর, পুতুল, ব্যাগ-সহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করা যায়। সেগুলি বাজারে বিক্রি করে আমরা নিজেরাই স্বনির্ভর হতে পারি। সংসারের আয়ও বাড়বে। তাই বেশি করে তালের আঁটি বসানো হচ্ছে।”আর এক মহিলার কথায়, “তালের আঁটি আগে থেকেই সংগ্রহ করে রাখা হয়েছিল। ফলে এবার কাজে সুবিধা হয়েছে।
আমরা চাই, গ্রামের প্রতিটি পাড়ার রাস্তার দু’পাশে তালগাছ তৈরি হোক এবং আগামী দিনে এই উদ্যোগ আরও বড় আকার নিক।”স্থানীয়দের দাবি, কদিন আগেই এই এলাকায় বজ্রপাতে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। এরপর থেকেই বজ্রপাত নিয়ে মানুষের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। তাঁদের বিশ্বাস, তাল গাছ তুলনামূলক ভাবে অনেক উঁচু হওয়ায় বজ্রপাতের সময় তা বিদ্যুৎ প্রবাহকে মাটির দিকে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই গ্রামে বেশি করে তালগাছলাগানো প্রয়োজন।তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তালগাছ বজ্রপাতের নিশ্চিত প্রতিরোধক নয় এবং শুধু তালগাছ লাগালেই বজ্রপাতের বিপদ থেকে নিরাপদ থাকা যায় না। বজ্রপাতের সময় ঘরের ভিতরে থাকা, খোলা মাঠ বা গাছের নিচে আশ্রয় না নেওয়া এবং প্রশাসনের বজ্রপাত সংক্রান্ত সতর্কতা মেনে চলাই সবচেয়ে জরুরি।প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই সময়ে কুলতলির গ্রামের মহিলাদের এমন উদ্যোগ তাইএকদিকে যেমন পরিবেশ রক্ষার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দরজাও খুলে দিতে পারে। তাঁদের এই উদ্যোগ আগামী দিনে আরও বড় আন্দোলনের রূপ নেয় কি না, এখন সেটাই দেখার।