পুবের কলম ওয়েব ডেস্কঃ  বিশ্বকবির জন্মস্থান জোড়াসাঁকো। অথচ সেই জোড়াসাঁকো বিধানসভা কেন্দ্রেই এখন ভোটের ভাগ্য নির্ধারণ করেন মূলত ‘অ-বাঙালি’ ভোটাররা। আর এই রূঢ় বাস্তবের কথা মাথায় রেখেই রাজ্যের চার প্রধান রাজনৈতিক দল তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস প্রত্যেকেই এই কেন্দ্রে অ-বাঙালি প্রার্থী দাঁড় করিয়েছে। তার উপর এবারের ভোটার তালিকা সংশোধনে এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৬.৮৫ শতাংশ ভোটারের নাম বাদ পড়ায় ভোটের সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জোড়াসাঁকো বাংলার নবজাগরণের এক ঐতিহাসিক পীঠস্থান। তবে ব্যালট বাক্সের সমীকরণে সেই ঐতিহ্যের ছবিটা এখন অনেকটাই পালটে গিয়েছে।

বর্তমানে বড়বাজার এবং তার আশেপাশের বাণিজ্যিক এলাকাগুলিতে অ-বাঙালিদের একচেটিয়া আধিপত্য। আর তাই, এখানকার ভোটের টিকিট পকেটে পুরতে হলে এই বিপুল সংখ্যক অ-বাঙালি ভোটারের মন জয় করা ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলির কাছে আর কোনও বিকল্প নেই।

এই সমীকরণের কথা মাথায় রেখেই তৃণমূল কংগ্রেস তাদের বর্তমান বিধায়ক বিবেক গুপ্তের জায়গায় কলকাতা পুরসভার দু’বারের কাউন্সিলর বিজয় উপাধ্যায়কে প্রার্থী করেছে। তৃণমূলের লক্ষ্য স্পষ্ট, অ-বাঙালি ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের অনুকূলে সংহত করা। অন্যদিকে, বিজেপি ময়দানে নামিয়েছে বিজয় ওঝাকে, যিনি নিজেও কলকাতা পুরসভার একজন পরিচিত মুখ। তাঁর ধারালো বক্তৃতা এবং রাজনৈতিক শায়ারি পুরসভার বিতর্কে আলাদা মাত্রা যোগ করে এবং দলের গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর একটা আলাদা আবেদন রয়েছে বলেও জানা যায়।

পিছিয়ে নেই বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেসও। বামেরা ভরত রাম তিওয়ারিকে এবং কংগ্রেস দীপক সিংকে জোড়াসাঁকোর প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এই কেন্দ্রে অ-বাঙালি ভোট কতটা নির্ণায়ক।

ঐতিহাসিকভাবে বড়বাজার এবং সন্নিহিত এই বাণিজ্য-প্রধান এলাকায় বিজেপির একটা প্রভাব থাকার কথা মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষকই। তবে অতীত পরিসংখ্যান ঘাঁটলে মিশ্র ফলাফলই চোখে পড়ে। একটা সময় এই আসন দীর্ঘদিন কংগ্রেসের দখলে ছিল। জনতা পার্টি এবং ফরওয়ার্ড ব্লকও একবার করে এখান থেকে জিতেছে।

কিন্তু ২০১১ সাল থেকে জোড়াসাঁকোর রাশ শক্ত হাতে ধরে রেখেছে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল।

গত ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে, তৃণমূলের বিবেক গুপ্ত ৫২,১২৩টি ভোট (৫২.৬৭ শতাংশ) পেয়ে জয়ী হন। তিনি ১২,৭৪৩ ভোটের ব্যবধানে হারান বিজেপির মীনা দেবী পুরোহিতকে, যিনি ৩৯,৩৮০টি ভোট (৩৯.৮০ শতাংশ) পেয়েছিলেন। সেই সময় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল ১,৯৭,৯০১ জন, যার মধ্যে ৯৯,১১৫ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছিলেন।

তবে এবারের চিত্রটা বেশ আলাদা। ভোটার তালিকা সংশোধনের  পর এই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৭২,৯০০টি নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, যা এখানকার মোট ভোটারের প্রায় ৩৬.৮৫ শতাংশ। বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়ার এই ঘটনা এবারের নির্বাচনকে এক নয়া মোড় দিতে চলেছে। যেখানে ইতিহাস আর বাণিজ্য পাশাপাশি চলে, সেই জোড়াসাঁকোতে শেষ হাসি কে হাসবে, তা এখন নির্ভর করছে ওই সংশোধিত অ-বাঙালি ভোটারদের মনকে কতটা বুঝতে পারেন, তার ওপরই।