বিপুল শঙ্কর বসু, রায়গঞ্জ: ভাঙা উঠোনে বসে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন ৬৬ বছরের জলিল আখতার। শরীরের ক্লান্তি চোখেমুখে স্পষ্ট, কিন্তু তার চেয়েও গভীর এক মানসিক ক্ষত গ্রাস করেছে উত্তর দিনাজপুরের করণদিঘি ব্লকের বাঘরই গ্রামের এই প্রবীণ মানুষটিকে। জন্মসূত্রে যে মাটিকে তিনি নিজের দেশ জেনে এসেছেন, যে দেশে ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নাগরিকের দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই দেশেই এক রাতে হঠাৎ তিনি হয়ে গেলেন ‘অনুপ্রবেশকারী’। দীর্ঘ তিন মাসের বন্দি জীবন, পুশব্যাকের আতঙ্কে কাটানো দিনগুলোর পর ইসলামপুর আদালত থেকে তিনি শর্তসাপেক্ষ জামিন পেয়েছেন ঠিকই, কিন্তু যে সম্মান ও মানসিক শান্তি খোয়া গেল, তার ক্ষতিপূরণ দেবে কে? এই প্রশ্ন এখন প্রতিধ্বনিত হচ্ছে জলিলের পরিবার ও গোটা গ্রামের মুখে।

চলতি বছরের ১৯ জুন রাতের আঁধার তখন নেমেছে করণদিঘির বাঘরই গ্রামে। বাইরে ঘুমোচ্ছিলেন জলিল আখতার।

হঠাৎ ডালখোলা থানার পুলিশের হানা। চোরের মতো টেনেহিঁচড়ে তাকে তুলে নিয়ে যায় থানায়। পরিবারকে বলা হয়েছিল পরিচয়পত্র নিয়ে এলে ছেড়ে দেওয়া হবে, কিন্তু পরে পরিবারের লোকেরা যখন ১৯৬৭ সালের পারিবারিক জমির দলিল, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড ও ভোটার কার্ডের মতো অকাট্য প্রমাণ নিয়ে হাজির হলেন, পুলিশ দেখা করার সুযোগটুকুও তাদের দেয়নি। এর পরবর্তী অধ্যায়টি কোনও দুঃস্বপ্নের চেয়ে কম ছিল না। বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার ঘুরে তার ঠাঁই হয় জেলে। তার আগে বৃদ্ধকে বাংলাদেশি বলে স্বীকার করতে মানসিক চাপ দেওয়া হয়। সীমান্ত পেরিয়ে ওপারে পাঠিয়ে দেওয়ার তোড়জোড়ও চলে।
অবশেষে তদন্তকারী আধিকারিক আদালতের সামনে সমস্ত নথির সত্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হন এবং বিচারক শর্তসাপেক্ষ জামিন মঞ্জুর করেন।

কিন্তু জামিন কি দীর্ঘ ৮৯ দিনের লাঞ্ছনা আর যন্ত্রণার উপশম হতে পারে? জলিল আখতারের গলা আজও কেঁপে ওঠে সেই রাতের কথা মনে পড়লে। ভারী গলায় তিনি বলেন, ‘আমি এ দেশের নাগরিক, সব কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও আমার কথা কেউ কানে তোলেনি। বিনা অপরাধে তিনটে মাস একটা অপরাধীর মতো বাঁচতে হলো। আমি এর সঠিক বিচার চাই।’ ক্ষোভ আর হতাশায় ভেঙে পড়েছেন বৃদ্ধের ভাই মহম্মদ মতিউর রহমান-ও।

তিনি বলেন, ‘প্রায় ৩ মাস ধরে আদালত, ডিআইবি আর থানার চক্কর কেটে আমরা নিঃস্ব হয়ে গেছি। একজন নিরপরাধ বৃদ্ধ মানুষকে চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে ঠেলে দেওয়া হলো। এই প্রশাসনিক ভুলের জন্য অবিলম্বে সরকারের পক্ষ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’

আইনি লড়াইয়ের এক পর্যায় হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু ঘরে ফেরা জলিল আখতার এখনও কার্যত গৃহবন্দি। কারণ আদালতের নির্দেশে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি এলাকা ছাড়তে পারবেন না। একজন বৃদ্ধ ভারতীয় নাগরিককে স্রেফ সন্দেহের বশে ভিনদেশি তকমা দিয়ে বন্দি করে রাখার এই প্রশাসনিক গাফিলতি এক গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও সুরক্ষা নিয়ে। এই অমানবিক হয়রানি ও সামাজিক অপমানের বিরুদ্ধে রাজ্য ও প্রশাসনের কাছে উপযুক্ত আর্থিক ক্ষতিপূরণ এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীদের শাস্তির দাবিতে একজোট হয়েছেন গ্রামবাসীরা।