শনিবার বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত ইতিহাস আড্ডার ৩৩তম পর্বে ‘রাজনীতির পালাবদলে ফররুখ আহমদ’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে কোনো কবির সাহিত্যকর্মকে অস্বীকার করা কিংবা তাকে একক কোনো আদর্শের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরা—দুটিই তার প্রতি অবিচার।
আরও পড়ুন:
কবি জাকির আবু জাফর বলেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে ফররুখকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তার সাহিত্যিক শক্তিকে উপেক্ষা করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
‘যখন কোনো জাতি তার শিল্প-সাহিত্যকে, তার কবিতাকে, তার কবিকে রাজনৈতিক বাটখারা দিয়ে ওজন করে, তাহলে সেই জাতি কখনো পৃথিবীতে সভ্য হতে পারে না,’ বলেন তিনি।
আরও পড়ুন:
ফররুখের কবিতার ভাষা, চিত্রকল্প ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দিয়ে জাকির আবু জাফর বলেন, ‘ফররুখ আহমদ শুধু তার আদর্শের জন্য টিকে নেই। তিনি টিকে আছেন তার শব্দের জন্য, তার বাণীর জন্য, তার চিত্রকল্পের জন্য। তিনি মানবতাবাদী, বিশ্বমানবতাবাদী কবি।’
আরও পড়ুন:
কবি, প্রাবন্ধিক ও শিল্পসমালোচক সাখাওয়াত টিপু বলেন, কবিকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে বিচার করলে তার ভাষা, কল্পনা ও নন্দনতত্ত্বের গুরুত্ব বোঝা যায় না।
‘কবি হচ্ছেন একজন সাধক। উনি মানুষের কথা বলেন, কল্পনার কথা বলেন, চিত্রকল্পের কথা বলেন, ভাষার পালাবদলের কথা বলেন, ভবিষ্যতের কথা বলেন, স্বপ্নের কথা বলেন,’ বলেন তিনি।আরও পড়ুন:
বাংলা ভাষার প্রতি ফররুখের অনুরাগ এবং ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে সাখাওয়াত টিপু বলেন, তাকে কোনো একক রাজনৈতিক বা ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়। ‘ফররুখ আহমদ আমাদের সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ শিল্পী এবং আমাদের সাহিত্যের যে সভ্যতা, সামনের পথ নির্মাতাদের একজন,’ বলেন তিনি।
আরও পড়ুন:
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক খোরশেদ আলমও রাজনৈতিক ও আদর্শিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে কবির সাহিত্য মূল্যায়নের ওপর জোর দেন। ফররুখের ‘সাত সাগরের মাঝি’ সময় অতিক্রম করে ধ্রুপদি মর্যাদা অর্জন করেছে উল্লেখ করে তিনি কবিতায় আরব-ফারসি ঐতিহ্য, বাংলা লোকসাহিত্য ও মানবতাবাদী চিন্তার বৈচিত্র্যের কথা তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন:
শিল্পী কামরুল হাসানের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সাজেন বলেন, ফররুখের চিন্তায় পরিবর্তন এলেও সাধারণ ও দরিদ্র মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতা অটুট ছিল।
১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে লেখা ‘লাশ’ কবিতায় সেই দায়বদ্ধতার প্রতিফলন দেখা যায়।আরও পড়ুন:
ফররুখ আহমদের পুত্র সৈয়দ ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘তিনি (ফররুখ আহমদ) সব সময় মানুষের জন্য লিখেছেন এবং তার চিন্তার কেন্দ্রে ছিল পিছিয়ে পড়া সমাজ। কেবল কবি হিসেবে না, একজন আপসহীন ব্যক্তি হিসেবেও তার সময়কালে তিনি পরিচিত ছিলেন।
আরও পড়ুন:
ফররুখ আহমদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য জানতে হলে তার সহকর্মীদের স্মৃতিকথা জানা জরুরি মন্তব্য করে তিনি তার কবিতা স্কুল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সিলেবাসে রাখার আহবান জানান।
আরও পড়ুন:
১৯১৮ সালে জন্ম নেওয়া ফররুখ আহমদ বাংলা সাহিত্যে ‘মুসলিম রেনেসাঁর কবি’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত তার ‘সাত সাগরের মাঝি’ বাংলা কবিতায় বিশেষ স্থান করে নেয়। তার কবিতায় মুসলিম ঐতিহ্য ও আরবি-ফারসি অনুষঙ্গের পাশাপাশি শোষণ, দারিদ্র্য ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও উঠে এসেছে।
১৯৭৪ সালে তার মৃত্যু হয়।আরও পড়ুন:
ফররুখ আহমদ খুলনা জেলা স্কুল থেকে ১৯৩৭ সালে ম্যাট্রিক এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে ১৯৩৯ সালে আই.এ. পাস করেন। এরপর স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শন এবং ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বামপন্থী রাজনীতিতে ঝুঁকে পড়েন। তবে চল্লিশ-এর দশকে তাঁর রাজনৈতিক বিশ্বাসে পরিবর্তন আসে।
আরও পড়ুন:
ফররুখ আহমদের কর্মজীবন শুরু হয় কলকাতায়। তিনি ১৯৪৩ সালে আই.জি.প্রিজন অফিসে, ১৯৪৪ সালে সিভিল সাপ্লাইতে এবং ১৯৪৬ সালে জলপাইগুড়িতে একটি ফার্মে চাকরি করেন। ১৯৪৫ সালে তিনি মাসিক মোহাম্মদীর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে শেষ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে চাকরি করেন ঢাকা বেতারে। দেশ ভাগের পর ১৯৪৮ সালে ফররুখ আহমদ কলকাতা থেকে ঢাকায় চলে এসে ঢাকা বেতারে যোগ দেন।