পুবের কলম প্রতিবেদক: জি-২০ সম্মেলনের সূচনায় বিভেদ মুছে একতার বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৮ তম জি-২০ সম্মেলন আয়োজিত হচ্ছে ভারতে, ঘোষিত সূচি অনুযায়ী বাংলার রাজধানী কলকাতায় দুটি বৈঠক হওয়ার কথা। সোমবার নিউটাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে হল তার সূচনা। আন্তর্জাতিক এই মঞ্চে ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর বার্তাই ছড়িয়ে দিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। বললেন, দআপনাদের দেশ, আমাদের দেশ বলে আমি বিভেদ করি না। গোটা বিশ্বই আমার মাতৃভূমি। আপনারা যখন এখানে এসেছেন, তখন এই বাংলা আপনারও।দ যেহেতু এদিনের আলোচ্য বিষয় ছিল মূলত অর্থনীতি, তাই মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে উঠে আসে এ রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ। রাজস্ব বৃদ্ধি থেকে শুরু করে জিডিপির হার বৃদ্ধি, করোনাকালে অর্থনৈতিক সচলতা বজায় রাখা-সহ একাধিক বিষয় সম্পর্কে ভাষণে বিস্তারিত বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
সোমবার নিউ টাউনে কনভেনশন সেন্টারে কলকাতায় জি-টোয়েন্টির বৈঠকের সূচনা হয়ে গেল। প্রথম দিনই দেশ এবং বিদেশের আগত অতিথিদের অভ্যর্থনা জানালেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার পর্যন্ত চলবে জি-২০ সম্মেলনের বৈঠক। বৈঠকে ডিজিটাল ফিনান্সিয়াল সিস্টেম নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে বলে জানা গিয়েছে।
এদিন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী তার বক্তব্যে বিভিন্ন দেশের রাজ্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। প্রথম বক্তব্যেই তার গলায় বসুদেব কুটুম্বকমের সুর। তিনি বলেন, আমি মনে করি আপনারা আমাদের পরিবারের সদস্যের মতোই। আমি দেশে দেশে বিভেদে বিশ্বাস করি না। আমি মনে করি গোটা বিশ্ব আমার মাতৃভূমি। যারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে এসেছেন আপনাদের খোলা মনে স্বাগত জানাচ্ছি। বাংলার মাটিকে নিজের বলেই ভাবুন। ১৪ মিনিটের কিছু বেশি সময়ের বক্তব্যে তিনি বাংলার পরিকাঠামোর কথা তুলে ধরেন। বাংলা যে এই মুহূর্তে গোটা দেশের উন্নয়নের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছে তাও জানান তিনি।
এদিন মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে করণাকালে কিভাবে তার সরকার মহামারীর সঙ্গে লড়াই করার পরও রাজ্যের জিডিপির বৃদ্ধি অক্ষুন্ন রেখেছে।
এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, কোভিড কালের ২ বছরে সব দেশ খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। আমাদের রাজ্যও তার থেকে ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু আমাদের রাজ্যের জিডিপি বেড়েছে ৪ গুণ। একইসঙ্গে তিনি কর্মসংস্থান সৃষ্টি নিয়েও রাজ্যের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন এক্ষেত্রে তিনি বলেন, করোনা কালে আমরা ১.২ কোটি চাকরির ব্যবস্থা করতে পেরেছি। কারণ, আমরা কৃষক, মহিলাদের এসময়ে আরও আর্থিক ভাবে শক্তিশালী করতে পেরেছি। ক্ষুদ্র মাঝারি এবং কুটির শিল্প সেক্টরে আমরা রয়েছি সারা দেশে ১ নম্বরে। এই সেক্টরের জন্যই এই বিশাল কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।
এদিন এই মঞ্চ থেকে তার সামাজিক প্রকল্পের ফিরিস্তি তুলে ধরতে ভুল করেননি মুখ্যমন্ত্রী। শুধু তাই নয় তার সামাজিক কর্মকাণ্ড গুলি যে আন্তর্জাতিক ও জাতীয় ক্ষেত্রে প্রশংসিত হয়েছে তাও এদিন এই মঞ্চ থেকেই তুলে ধরেছেন মমতা। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, আমাদের সরকার রাজ্যের সব মানুষকে বিনামূল্যে খাবার দেয়। রাজ্যের সব মেয়েদের দেওয়া হয় এডুকেশনাল স্কলারশিপ। মেয়েদের এই স্কিমের জন্য আমরা আন্তর্জাতিক সম্মানও পেয়েছি।
এই মঞ্চ থেকে এদিন মুখ্যমন্ত্রী সবুজ সাথী, স্বাস্থ্যসাথী, লক্ষ্মীর ভান্ডারের কথাও তুলে ধরেছেন। নারী ক্ষমতায়নকে মাথায় রেখে তিনি তথা তার সরকার যে মহিলাদের ব্যাংক একাউন্টে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রত্যেক মাসে মাসে দিচ্ছে সে কথাও তুলে ধরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই মঞ্চ থেকেই এদিন ‘দুয়ারে সরকার’ প্রকল্পের সাফল্য তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারি পরিষেবাকে সরাসরি মানুষের দরজায় পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এই প্রকল্প নিয়েছে তার সরকার। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের জন্য রাজ্যকে সেরা পুরস্কার দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তিনি আরো জানান, স্কুল পড়ুয়াদের সাইকেল এবং স্মার্টফোন দেওয়া হয় এই রাজ্যে। বলেন, জাতি এবং ধর্ম নির্বিশেষে সকলকেই স্কলারশিপ দেওয়া হয়। এদিন রাজ্যের ক্ষুদ্র শিল্পের সাফল্যের কথাও বিশেষ ভাবে তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রসঙ্গত জি-টোয়েন্টি এই সম্মেলন আজ অর্থাৎ সোমবার থেকে শুরু হলেও চলবে বুধবার পর্যন্ত। এই সম্মেলনকে সামনে রেখেই সেজে উঠেছে শহর কলকাতা। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বাইপাস সর্বত্রই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবিতে সেজে উঠেছে। কনভেনশন সেন্টার সাজানো হয়েছে এই সম্মেলনে যোগদানকারী বারোটি দেশের পতাকায়। কোন সন্দেহ নেই এই সম্মেলন শুধু রাজ্যের জন্য নয় দেশের জন্য খুব গর্বের। তাই রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলেও আয়োজনে কোনরকম খামতি রাখছে না রাজ্য সরকার। এখনো পর্যন্ত যতটুকু জানা গিয়েছে কনভেনশন সেন্টার ছাড়াও জে ডাব্লু ম্যারিয়ট হোটেলে এই কনভেনশনের অনুষ্ঠান হওয়ার কথা।
জি-টোয়েন্টি সদস্য দেশগুলি ছাড়াও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সদস্য দেশ, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক, ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক, নাবার্ড, এবং আইএমএফ-এর মতো সংস্থার প্রতিনিধিরাও যোগ দিয়েছেন এই বৈঠকে। আজ প্রথম দিনের বৈঠকের পরে, অতিথি-অভ্যাগতদের জন্য গঙ্গা বক্ষে ক্রজে নৈশভোজের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার নিউটাউনের পালকুটিরে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে ব্যবস্থা থাকছে মনজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও। এছাড়া যতদূর জানা যাচ্ছে বুধবার, বৈঠকে যোগ দেওয়া অতিথিদের ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল ঘুরিয়ে দেখানো হবে। একই সঙ্গে থাকবে স্ট্রিট ফুড উপভোগ করার সুযোগ।






























