পুবের কলম, নানুর: "বিজেপি আপনাদের লাইনে দাঁড় করিয়েছে, আপনারা তাদের বেলাইন করুন"। বুধবার নানুরের পাপুড়ীর আল-আমীন মডেল স্কুল মাঠে "এস আই আর" নিয়ে গর্জে উঠলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, এতদিন বাঁচার পর যদি প্রমাণ করতে হবে, আমি অনুপ্রবেশকারী নই? তারপর কেন্দ্র সরকারকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, মমতা বলেন, ‘‘বিহারে ভোটের আগে চুপি চুপি অ্যাকাউন্টে আট হাজার টাকা ঢোকাল। এখানেও শুনছি গরিব মানুষদের কাছে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট চাইছে। খবরদার দেবেন না। যা আছে সেটাও নিয়ে নেবে। টাকা ঢোকানোর নাম করে কেটে নেবে। বিজেপি-কে একেবারে বেলাইন করে দিন। বাংলা ভাষায় কথা বললেই অনুপ্রবেশকারী? অনুপ্রেবেশ কোথাও হয়ে থাকলে তার দায় নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের। বিপদে পড়লে পাশের দেশ আশ্রয় দেয়। আপনারা কত জনকে ঢুকিয়েছেন, আমরা জানি। আমি এ নিয়ে চিঠিও দিয়েছি।’’
 
পাশাপাশি, প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় সতর্ক থাকার কথা বলেছেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘সবকিছু বদলে গিয়েছে। নতুন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে। কমিশন যাঁদের নিয়োগ করেছেন, আপনাদের মনোনয়ন বাতিলে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছ। তাই মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় সতর্ক থাকুন।’’ বিদেশ থেকে কতজন, কে ঢুকিয়েছে, সব খবর আছে। আমি চিঠি দিয়ে জানিয়েছি। এদিন এটাই ছিল মমতার প্রথম সভা। এদিন আরও তিনটি জনসভা ছিলো তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। দ্বিতীয়টি ছিলো বড়ঞা এবং তৃতীয় সভাটি ছিল জঙ্গিপুরে। এদিন নানুর বিধানসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী বিধানচন্দ্র মাঝির সমর্থনে প্রচারসভায় উপস্থিত ছিলেন কেতুগ্রাম বিদায়ী বিধায়ক শেখ শাহনাওয়াজ, বোলপুর বিদায়ী বিধায়ক চন্দ্রনাথ সিনহা, রামপুরহাট বিদায়ী বিধায়ক আশীষ বন্দ্যোপাধ্যায়, দুবরাজপুর প্রার্থী নরেশ চন্দ্র বাউড়ী, হাঁসন প্রার্থী ফয়েজুল হক ওরফে কাজল, সাংসদ অসিত প্রমুখ। তবে এদিন সুদীপ্ত ঘোষের এবং কেষ্ট মণ্ডলের নাম মুখ্যমন্ত্রীর মুখে শোনা গেলেও, মঞ্চে তাঁদের দেখা যায় নি। তা নিয়ে শুরু হয় রাজনৈতিক গুঞ্জন। 
 

মমতা মহিলাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনারা আজীবন লক্ষীর ভান্ডার চান তো? তাহলে জোড়া ফুলে ভোট দেবেন। যেদিন মহিলাদেরও নোট বন্দির লাইনে দাঁড় করিয়েছিল আমার মনে আছে। সংসারের খরচ বাঁচিয়ে মহিলারা অল্পস্বল্প সঞ্চয় করেন। সেই টাকা নোট বন্দির সময় বাতিল হয়ে যায়। সেদিন থেকেই আমার মাথায় মহিলাদের জন্যই লক্ষ্মী ভান্ডার প্রকল্পের কথা মাথায় আসে। আজ মহিলাদের টার্গেট করা হয়েছে। মমতা বলেন, ‘‘সবচেয়ে বেশি মহিলাদের নাম কাটা গিয়েছে। অনেকেই বিয়ের পর শ্বশুর বাড়ি চলে গিয়েছে। পদবি পাল্টে গেলেই নাম বাদ কেটে দিয়েছে।’’ উকুন বাছা করে মহিলাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এর জবাব আপনাদের দিতে হবে। গ্যাসের 

দামবৃদ্ধি নিয়ে খোঁচা মমতার


নানুরের সভা থেকে মমতা বলেন, ‘‘গতকালও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে।

এর পর ভোট হয়ে গেলে গ্যাসও পাবেন না, উনুনে রান্না করতে হবে। বিনা পয়সায় রেশন দিচ্ছে তৃণমূল সরকার, আর প্রচার করতে বিজেপি। এদের লজ্জা করে না?’’ হাজার টাকা করে নিয়েছে আধার কার্ড করতে, নিয়েছে চার কপি করে ছবি। এখন বলছে- আধার কার্ড নো পাপা, 'এস আই আর' ইয়েস পাপা। এরপর এন আর সি, সেনসাস, তারপর ডিটেনশন ক্যাম্প। 

গ্যাসের দামবৃদ্ধি নিয়ে খোঁচা মমতার


 নানুরের সভা থেকে মমতা বলেন, ‘‘গতকালও গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। এর পর ভোট হয়ে গেলে গ্যাসও পাবেন না, উনুনে রান্না করতে হবে। বিনা পয়সায় রেশন দিচ্ছে তৃণমূল সরকার, আর প্রচার করতে বিজেপি। এদের লজ্জা করে না?’’

তারপর মহিলাদের সাবধান করে মমতা বলেন, এরা প্ল্যান নিয়েছে মহিলাদের চেক করবে। মহিলাদের গায়ে হাত দেবে। ঠিক আছে, মহিলাদের গায়ে হাত দাও, তারপর মহিলারাই বুঝে নেবে। তোমাদের ঘরে মা বোন নেই? এরা প্ল্যান করেছে , নমিনেশন ফাইল রিজেক্ট করবে। ভোটের দিন হঠাৎ অন্ধকার করে মেশিন পাল্টাতে পারে। আমি বলব মেশিন খারাপ হলে, সেই মেশিনে আর ভোট দেবেন না। ভিপিপ্যাড না দেখে না চেক করে ছাড়বেন না। খেলা হবে।দুরন্ত খেলা হবে। বিজেপির সূর্যাস্ত খেলা হবে। বাংলাকে টার্গেট করলে এবার দিল্লী হবে টার্গেট। আমার ভবানীপুর কেন্দ্রেও অনেক নাম বাদ দিয়েছে।তবে সুপ্রিম-নির্দেশে এদিন সন্তোষ প্রকাশ করেন মমতা। 

নানুরের সভা থেকে সুপ্রিম কোর্টে এসআইআর মামলার নির্দেশ নিয়ে নিজের মতপ্রকাশ করেন মমতা। তিনি বলেন, ‘‘আজ আমি খুশি। সুপ্রিম কোর্ট ভাল রায় দিয়েছে। পদ্ম ফুলের বস্তা দিয়ে ফর্ম ৬ জমা করে বাইরে নাম ঢোকাচ্ছিল। সুপ্রিম কোর্ট বলে দিয়েছে হবে না।’’ মমতা বলেন, ‘‘আমি সুপ্রিম কোর্টে ছুটে গিয়েছিলাম। আমি যত দূর জেনেছি ২২ লক্ষের নাম আমরা এখনও পর্যন্ত তুলতে পেরেছি। ১৮ লক্ষ বাদ আছে, তাঁদের প্রত্যেককে আপিল করতে হবে। ট্রাইবুনালে যেতে হবে। খরচ আমরা দেব। ঘাবড়াবেন না। আগে যারা বিচারাধীন আছেন, ট্রাইব্যুনালে তারা যাবেন। সমস্ত কাগজ জমা দেবেন। তাদের সমস্ত নাম উঠবে। আমাদের বি এল এ ওয়ান বিএল এ টু এস আই আর ক্যাম্পে আপনাদের সাহায্য করেনি? তাই চিন্তা করবেন না।

 

অমর্ত্য সেনের জমি কেড়ে নেওয়া আটকেছি: মমতা
 নানুরের সভায় দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, ‘‘বোলপুর, শান্তিনিকেতন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মাটি। সেখানে অমর্ত্য সেনের জমি রয়েছে। সেই জমিও কেড়ে নেওয়া হচ্ছিল। জানতে পেরে আমি ছুটে এসেছিলাম।’’ তিনি বলেন, আজও ডায়মন্ড হারবারে একজন এয়ারও মারা গেছেন। বিষ পান করেছেন। কাজের চাপ নিতে পারেননি। সারা রাজ্যে ২২৫ জনের উপর মারা গেছেন। মমতা বলেন, এই বিজেপি সরকার ২০২৬ এর টিকবে না। এরা আইপিএস - আইপিএস, ডাব্লিউবিসি এস - ডব্লিউ বিসিএস এর এর মধ্যে ভাগাভাগি করছেন। যেটা আগে কখনো হয়নি। কেন? নিজেদের লোক খুঁজছেন? বিহার মহারাষ্ট্র হরিয়ানা এরা বুঝতে পারেনি। বাংলা আলাদা। ওই জায়গাগুলোতে ছলনা করে বিজেপি জিতেছে। মমতা বলেন, মনে রাখবেন বিজেপি বক ধার্মিক। আমাদের কাছে কর্মই ধর্ম।ওরা গান্ধীজিকে বর্জন করেছে, আমরা গ্রহণ করেছি’

১০০ দিনের প্রকল্পের নাম পরিবর্তন নিয়ে আবার কেন্দ্রকে আক্রমণ মমতার। তিনি বলেন, ‘‘ওরা আমাদের ১০০ দিনের কাজের টাকা আটকে রেখেছে। গান্ধীজির নামও মুছে দিয়েছে প্রকল্প থেকে। ওরা যে দিন বর্জন করেছে, আমরা সে দিনই গ্রহণ করেছি। মহাত্মাশ্রী শুরু করেছি রাজ্যে।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘বলছে বাংলা নাকি রক্তাক্ত। বাংলার মতো শান্ত, সম্প্রীতি, শক্তি কোথাও নেই।’’ তিনি বলেন, সিউড়িতেও রামনবমী তে ওরা বন্দুক নিয়ে আস্ফালন করেছে।  এদিন নানুরের সভা থেকে মমতা বলেন, ‘‘লড়াই করতে হলে সামনাসামনি করো, লুকিয়ে লুকিয়ে করছ কেন? তৃণমূলকে বলছে চোর! এখানে অনেক বিজেপি নেতা রয়েছেন, বিজেপির দল থেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি করা হয়েছে। তার কাগজপত্র তো আমার কাছেও আছে। তৃণমূল চোর নয়। বিজেপি সব লুট করেছে।’’

কে কী পরবে? কে কী খাবে? তার নিদান বিজেপির নেতৃত্ব মাঝে মধ্যে দিয়ে থাকেন। তাদের উদ্দেশ্যে নানুরের সভা থেকে মমতা বলেন, বিজেপি এলে বাঙালির মাছ খাওয়া বন্ধ করে দেবে। ডিম খাওয়া বন্ধ করে দেবে। উল্লেখ্য, ব্রিগেডে গীতা পাঠের আসরে চিকেন প্যাটিস বিক্রেতা মারধর করে বিজেপি সমর্থক। তারপর তোলপাড় হয় রাজ্যরাজনীতি। এদিন মমতা বলেন, বিজেপির মিথ্যা কথা শুনবেন?

টোটাল জুমলা। বছরে দুকোটি চাকরি দেব বলেছিলো, একটাও দেয় নি। এদের নেতারা একাউন্ট নাম্বার চাইলে দেবেন না যেটুকু টাকা আছে, সব চলে যাবে। বিজেপি টোটাল জুমলা। এরা সব পারে। এ আই দিয়ে আমার গলা নকল করে হ্যাক করতে পারে। এরা কাগজে এ্যাড দিয়ে মিথ্যা কথা বলে। আমরা রেশন দিই। ওরা বলে আমরা দিই। পাইপ লাইনে জল সরবরাহ করছি। এই জল মিশন বলছে ওদের। তাহলে টাকা দিস না কেন? আমরা স্বাস্থ্য সাথী কার্ড করেছি। ওরা আয়ুস্মানের কথা বলে। ওটা চালু করলে ৪০ শতাংশ আমাদের দিতে হতো। আর আপনার বাড়িতে টিভি, স্কুটি থাকলে আপনি পাবেন না। এ আবার কী নিয়ম? 

স্বাস্থ্য সাথীতে আমরা সবাইকে দিই। এক কোটি কন্যাশ্রী আমাদের প্রাপক। সারা ভারতে দারিদ্র্যসীমা ৪০ শতাংশ। আমাদের বাংলায় আমরা চল্লিশ শতাংশ নামিয়েছি । অর্থাৎ এক কোটি ৭৫ লক্ষ মানুষকে এই দারিদ্র্যসীমার উপরে তুলেছি। রেলমন্ত্রী থাকার সময় আমি ইজ্জত কার্ড চালু করেছিলাম মানুষের সুবিধার জন্য। সেটা ওরা তুলে দিয়েছে। এই নানুর আমাকে শিক্ষা দিয়েছে। আমি যখন রেলমন্ত্রী ছিলাম, তখন ২০০০ সালের ২৭ জুলাই এই নানুরে ১১ জন খেতমজুরকে কুপিয়ে ফোন করেছিল সিপিএমের হার্মাদ। আমি রাজধানী এক্সপ্রেসে দুর্গাপুরে নামি। সেখান থেকে নানুরে আসি। তার আগে আমার প্রায় এত আত্ম সহায়ক গৌতম বসুকে পাঠায়। তিনি আমাকে জানান, মৃতদেহ গুলো ঢাকার জন্য একটা সাদা কাপড়ও নেই। তখন থেকেই আমার মাথায় আসে যদি কোনদিন রাজ্যে ক্ষমতায় আসি তাহলে সমব্যথী প্রকল্প চালু করব। যাতে করে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে যে কোন মানুষ যিনি কবরেই যান বা শ্মশানেই যান বা কোন থানেই যান তাকে যেন সরকার সাহায্য করে। আমরা এই সমব্যথী প্রকল্পে এই শেষকৃত্য সম্পন্ন করার জন্য দু হাজার টাকা করে দিয়ে থাকি। আমাদের এখানে এই বোলপুর এই বিশ্ববাংলা বিশ্ববিদ্যালয় করেছি ৩১ একর জায়গার উপর। যাতে করে ছাত্রছাত্রীরা এখানে পড়ার সুযোগ পায়। অনেকেই শান্তিনিকেতনে পড়াশোনা করতে চায়। এই বোলপুরেই মহিলাদের জন্য সেলফ গ্রুপের বিভিন্ন ক্লাসটার করা হয়েছে। তারা আজকে স্বনির্ভর। বিদেশি পর্যটকরা এসে তাদের কাছ থেকে ব্যাগ কিনে নিয়ে যান। আমাদের রাজ্যের দেড় কোটি পরিযায়ী শ্রমিক বিভিন্ন রাজ্য থেকে এসে কাজ করে। আমরা তাদের সম্মান দিয়ে রেখেছি। অথচ উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, বিহার, তামিলনাড়ু, মহারাষ্ট্র এই সমস্ত রাজ্যে আমাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর শুধু বাংলা বলার জন্য অত্যাচার করা হচ্ছে। লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি দেখিয়ে মানুষের ঘেঁটি ধরে ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চাইছে অমিত শা।