ব্রিটিশ ভারতে অখন্ড বাংলার প্রথম মন্ত্রিসভা গঠিত হয় ১৯৩৭ সালে। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একে ফজলুল হক। তারপর থেকে খন্ডিত বাংলায় যত মন্ত্রিসভা গঠিত হয়েছে, তাতে মুসলিমদের স্পষ্ট উপস্থিতি ছিল। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায়ের আমলে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভায় ৫টি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন মুসলিমরা। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভ করেছে। কিন্তু তাদের একজনও মুসলিম জনপ্রতিনিধি নেই। কাজেই এই প্রথম পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রিসভায় কোনও মুসলিম প্রতিনিধি থাকবেন না। ফলে ২৭ শতাংশ (বর্তমানে ৩০ শতাংশ) জনগোষ্ঠীর কোনও কণ্ঠস্বর থাকবে না নীতি-নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করার মন্ত্রিসভায়। এ নিয়ে লিখেছেন সাবির আহমেদ

পশ্চিমবঙ্গের সপ্তদশ বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিপুল জয়ের ফলে রাজ্যের সংখ্যালঘুদের ওপর ব্যাপক প্রভাব পড়তে পারে। এই প্রথম শাসক দলের কোনও মুসলিম প্রতিনিধি নতুন বিধানসভায় থাকছেন না। ফলে রাজ্য মন্ত্রিসভায়ও এই সম্প্রদায়ের কোনও মন্ত্রী থাকবে না। একই চিত্র বিজেপি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সংসদেও দেখা গেছে। কারণ, এখন আর কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কোনও মুসলিম মন্ত্রী নেই। অথচ ভারতে মুসলিমদের জনসংখ্যা ২০ কোটির উপর।

পশ্চিমবঙ্গে এর একটি বড় প্রভাব হবে নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘুদের কণ্ঠস্বরের সুস্পষ্ট অনুপস্থিতি। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের সংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ হলেও, মন্ত্রিসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় নীতি ও পরিকল্পনায় তাঁদের মতামত অদৃশ্য থেকে যাবে।

বিজেপির নির্বাচনী প্রচার জুড়েই মুসলিমদের বিরুদ্ধে তাদের একাধিক তীব্র ও বিদ্বেষী মন্তব্য চোখে পড়েছে। ধর্মীয় মেরুকরণের ভিত্তিতে ক্ষমতায় আসা কোনও দল রাজ্যের একটি বড় জনগোষ্ঠীকে প্রান্তিক করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে, এমনটা ভাবা অস্বাভাবিক নয়। 

ভারতের সংবিধানে ‘কণ্ঠস্বরে’র গুরুত্ব স্পষ্ট ভাবে স্বীকৃত। সংবিধান প্রণেতারা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর উদ্বেগকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছিলেন। আর যাদের দাবি জোরালোভাবে প্রকাশ পায় না, তাঁদের জন্যও সুরক্ষা ও অধিকারকে নিশ্চিত করেছিলেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি ক্রমশ ক্ষয়ে গিয়েছে। নীতি নির্ধারণ ও শাসন ব্যবস্থায় প্রান্তিক কণ্ঠস্বর এখন অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত ও অনুপস্থিত।

অ্যালবার্ট ও হার্শম্যানের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ এক্সিট ভয়েস অ্যান্ড লয়ালটির তত্ত্বের ভিত্তিতে বলা যায় জননীতির নির্ধারণে কণ্ঠস্বর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে যখন প্রস্থান বা এক্সিটের পথ খোলা থাকে না তখন নিজের অবস্থান জানানোর একমাত্র উপায় হয়ে ওঠে নিজের কণ্ঠ তুলে ধরা।

বাংলার মুসলিমদের মধ্যে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্থান হলেও, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে দর কষাকষি করার মতো কোনও স্পষ্ট সমষ্টিগত কণ্ঠস্বরের অভাব রয়ে গেছে। ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থানের ফলে নীতি-নির্ধারণের পরিসর আরও অনেকটাই সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমরা সামাজিকভাবে প্রান্তিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রায় অদৃশ্য এক গোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে।

স্বাধীনতার পর বহু দশক কেটে গেলেও, জনপরিসরে কংগ্রেসের হাতেগোনা কয়েকজন নেতা যেমন এবিএ গণি খান চৌধুরী এবং আবদুস সাত্তার ছাড়া তেমন কোনও বড় মুসলিম নেতৃত্ব দেখা যায়নি। দীর্ঘ বামফ্রন্ট শাসনকালেও মুসলিম নেতৃত্ব মূলত সীমাবদ্ধ ছিল কয়েকজন ব্যক্তির মধ্যে, যেমন মুহাম্মদ সেলিম, মুহাম্মদ আমিন এবং সাইফুদ্দিন চৌধুরী। 

বামফ্রন্ট আমলে উচ্চবর্ণের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। এর প্রতিফলন দেখা গেছে দলীয় কাঠামোতে। সেইসঙ্গে প্রশাসনে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া থেকে পদ্ধতিগতভাবে মুসলিমদের বাদ দেওয়া হয়েছিল। 

রাজনৈতিক তত্ত্ববিদ অ্যান ফিলিপসের পলিটিকস অফ প্রেজেন্স ধারণার আলোকে দেখা দরকার, শাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে গড়ে উঠেছে বা কোথায় ঘাটতি রয়ে গেছে।

অ্যান ফিলিপসের ‘পলিটিক্স অব প্রেজেন্স’ ধারণা অনুযায়ী, নারী, সংখ্যালঘু এবং ঐতিহাসিকভাবে বঞ্চিত সামাজিক গোষ্ঠীগুলির ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে এই উপস্থিতি বা ‘প্রেজেন্স’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ক্ষেত্র, মন্ত্রিসভা এবং রাজনৈতিক দলগুলিতে কোনও নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সদস্যদের উপস্থিতি বাড়লে তাদের মতামত, অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ ও শোনার সুযোগও তৈরি হয়। এই প্রেক্ষাপটে একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল, রাজ্যের বিধানসভায় মুসলিম প্রতিনিধিত্বের সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বৃদ্ধি পেয়েছিল।

তবে, এই প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি নতুন কিছু নয়। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বহু দশক ধরেই এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ২০১১ সালে বিধানসভায় মুসলিম বিধায়কের হার ছিল ২০.৪ শতাংশ যা ২০২১-এ কমে দাঁড়ায় ১৪.৭ শতাংশে। প্রায় ৬ শতাংশ পতন। 

২৯৪ জন বিধায়কের মধ্যে গত বিধানসভায় প্রায় ২০ শতাংশ মুসলিম ছিলেন এবং ৪৪ জন মন্ত্রীর মধ্যে ৫ জন এই সম্প্রদায়ভুক্ত।

তবে নগরোন্নয়ন ও পুর বিষয়ক দফতর ছাড়া মুসলিম মন্ত্রীদের হাতে খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা প্রভাবশালী দফতর দেওয়া হয়নি।

রাজ্যে ভারতীয় জনতা পার্টির উত্থান এবং শাসক দলে কোনও মুসলিম বিধায়ক না থাকায় এই প্রতিনিধিত্ব আরও কমার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বর্তমান বিধানসভায় মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৩, অর্থাৎ প্রায় ১১.২২ শতাংশ। ১৯৬৯ সালের পর এটাই সর্বনিম্ন। 

এই পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির উত্থানও লক্ষ্য করা গেছে। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) মতো দল এবং প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবিরের মতো নেতাদের উদ্যোগ মুসলিম ভোটকে বিভিন্ন দিকে ভাগ করে দিয়েছে এই নির্বাচনে।

সপ্তদশ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় রাজ্যের জনসংখ্যার তুলনায় মুসলিম প্রতিনিধিত্বে বড় ফাঁক স্পষ্ট। প্রায় ২৭ শতাংশ মুসলিম জনসংখ্যা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন কমিটিতে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব মাত্র ১৪.৮ শতাংশ। সংখ্যালঘু বিষয়ক স্থায়ী কমিটিকে বাদ দিলে এই হার আরও কমে ১৪.৩ শতাংশে নেমে এসেছে। কারণ, সংখ্যালঘু বিষয়ক কমিটিতে স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যালঘু সদস্যদের সংখ্যা একটু বেশি থাকে।

চলমান এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রেক্ষিতে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে, যা সংখ্যালঘুদের আরও প্রান্তিক করে দিচ্ছে বলে আশঙ্কা। বিশেষ করে ভোটাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে। এই কাঠামোগত ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক আলোচনায় সংখ্যালঘু তোষণের বিষয়টি বারবার উঠে আসছে, বিশেষ করে ধর্মীয় মেরুকরণের আবহে।

তবে মূল প্রশ্ন হল, এই তথাকথিত তোষণের নীতিগুলি গত ১৫ বছরে অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনে মুসলিমদের জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পেরেছে।

যদিও সংখ্যালঘুদের জন্য কিছু প্রতীকী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবে বৃহত্তর চিত্র বলছে, রাজ্যে মুসলিমদের সামগ্রিক উন্নয়ন এখনও অনেক পিছিয়ে রয়েছে। বিভিন্ন মানব উন্নয়ন সূচক সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ নীতি পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ক্ষেত্রে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে।