উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় :সুন্দরবনে ফের বাঘের হামলা। জঙ্গলের পাশের নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের হামলায় গুরুতর জখম হলেন কুলতলির এক মৎস্যজীবী। বুধবার সকালে কালিবেড়া জঙ্গল সংলগ্ন এলাকায় জাল পাতার সময় পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁর ঘাড়ে কামড় বসায় বাঘ।সঙ্গীরা কোনওরকমে বাঘের মুখ থেকে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় ওই মৎস্যজীবী বর্তমানে কলকাতার পিজি হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে চিকিৎসাধীন। মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন তিনি।স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কুলতলির মৈপীঠ নগেনাবাদের বাসিন্দা আজিজ মোল্লা মঙ্গলবার আরও পাঁচ সঙ্গী—আনচার মোল্লা, হজরত মোল্লা, হাফিজুল মোল্লা, রাজ্জাক মোল্লা ও আলম মোল্লাকে সঙ্গে নিয়ে বন দফতরের অনুমতি নিয়ে সুন্দরবনে মাছ ধরতে যান। বুধবার সকাল সাতটা নাগাদ কালিবেড়া জঙ্গল সংলগ্ন নদীতে তাঁরা জাল পাতছিলেন। সেই সময় আচমকাই জঙ্গল থেকে একটি বাঘ বেরিয়ে এসে পিছন থেকে আজিজ মোল্লার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তাঁর ঘাড়ে আক্রমণ করে বাঘটি।বাঘের হামলার পর প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সঙ্গীরা তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত কোনওরকমে বাঘের কবল থেকে আজিজকে উদ্ধার করে নদী থেকে নিয়ে আসেন তাঁরা। হামলায় তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ গুরুতর জখম হয়।প্রথমে তাঁকে জয়নগর কুলতলি গ্রামীণ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় দ্রুত তাঁকে কলকাতার পিজি হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই বর্তমানে চিকিৎসাধীন তিনি।
আজিজ মোল্লার পরিবারে রয়েছেন বাবা-মা এবং চারটি ছোট সন্তান। দীর্ঘদিন ধরে মৎস্যজীবী হিসাবে কাজ করেই সংসার চালান তিনি।
পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যের এমন গুরুতর জখমের ঘটনায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পরিবারের সদস্যরা।চিকিৎসার খরচের পাশাপাশি আগামী দিনে সংসার এবং সন্তানদের পড়াশোনা কীভাবে চলবে, তা নিয়েও আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে, চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত সুন্দরবনে বাঘের হামলায় ১৩ জন আক্রান্ত এবং তাঁদের মধ্যে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআর। দীর্ঘদিন ধরেই সুন্দরবনের মৎস্যজীবীদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে সংগঠনটি।এপিডিআরের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার সহ-সম্পাদক মিঠুন মণ্ডল বলেন, ‘‘গত ৩ জুন গোপাল নস্কর নামে এক মৎস্যজীবী বাঘের আক্রমণে নিহত হন। সেই সময় তাঁর স্ত্রী মমতা নস্কর অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।গত ৬ ই অগাস্ট তাঁর একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। বন দফতরের কাছে ক্ষতিপূরণের আবেদন করা হলেও এখনও টাকা দেওয়া হয়নি।’’তিনি আরও জানান, চার কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ এবং তাঁদের বেঁচে থাকার অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে মমতা নস্কর কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন।
গত ১ সেপ্টেম্বর মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে এপিডিআরের দাবি। মামলাটির নম্বর WPA No. 2026 F/24197/26 C.25। আইনজীবী ভাস্কর রায় তাঁর পক্ষে মামলাটি দায়ের করেছেন বলে সংগঠনের তরফে জানানো হয়েছে।
আজিজ মোল্লার ঘটনায় সরকারের কাছে একাধিক দাবি জানিয়েছে এপিডিআর। সংগঠনের দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আহত মৎস্যজীবীর চিকিৎসা এবং অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা বিনামূল্যে করতে হবে। যতদিন না তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে কাজে ফিরতে পারছেন,ততদিন তাঁর পরিবারের সংসার খরচ এবং সন্তানদের পড়াশোনার দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী আহত মৎস্যজীবীকে অবিলম্বে ৪ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
মিঠুন মণ্ডলের বক্তব্য, ‘‘সুন্দরবনের এই অসহায় মৎস্যজীবীদের পরিবারের বিষয়টি সরকারকে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে। দাবি পূরণ না হলে আমাদের আন্দোলন চলবে।’’অন্যদিকে, বুধবারের বাঘের হামলার ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জেলা বন দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে।