উজ্জ্বল বন্দ্যোপাধ্যায় : বেআইনি টোটো ও মোটরভ্যানের দাপটে এমনিতেই যানজটে নাকাল জয়নগর মজিলপুর শহর। তার মধ্যেই ওই সমস্ত গাড়ির কাছ থেকে টাকা নিয়ে ‘পৌরসভার লাইসেন্স’ দেওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। গাড়িচালকদের একাংশের পাশাপাশি এই টাকা আদায়ের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শাসক বিজেপির শহর মণ্ডল সভাপতিও। যদিও পৌরসভার দাবি,দীর্ঘদিন ধরেই এই টাকা আদায় করা হচ্ছে এবং এটি মূলত পৌর এলাকায় চলাচলের উপর ধার্য করা ট্যাক্স।জয়নগর মজিলপুর পৌর শহরের উপর দিয়ে প্রতিদিন কয়েকশো ভ্যান, মোটরভ্যান ও টোটো চলাচল করে। অন্যান্য বছরের মতো এ বছরও পুজোর আগে ওই সমস্ত যানবাহনের কাছ থেকে টাকা আদায় শুরু করেছে পৌরসভা। জানা গিয়েছে, ভ্যান ও মোটরভ্যানের ক্ষেত্রে ২০০ টাকা এবং টোটোর ক্ষেত্রে ২৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। বিনিময়ে পৌরসভার নাম ও লাইসেন্স নম্বর লেখা একটি টোকেনএবং টাকা নেওয়ার রসিদ দেওয়া হচ্ছে।
এই কাজের জন্য পৌরসভার ১৪ জন অস্থায়ী কর্মীকে কাজে লাগানো হয়েছে বলে পৌরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে।তবে প্রশ্ন উঠছে, যে যানবাহনের সরকারি বৈধতাই নেই, সেই যানবাহনের কাছ থেকে পৌরসভা কীভাবে টাকা নিয়ে লাইসেন্স নম্বর-সহ টোকেন দিচ্ছে? ওই টোকেন কি শুধুই পৌরসভার অভ্যন্তরীণ কর আদায়ের প্রমাণ, নাকি তা যানবাহন চলাচলের বৈধ অনুমতি হিসেবে চালকদের কাছে ভুল বার্তা তৈরি করছে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে জয়নগরে।এক গাড়িচালকের কথায়, ‘‘আমাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে রসিদ এবং একটি টিনের কুপন দেওয়া হচ্ছে। টাকা নেওয়ার পরে পৌরসভা আমাদের কী ধরনের নিরাপত্তা দেবে, সেটাই বুঝতে পারছি না।’’শাসকদলের অন্দরেও অবশ্য এই ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিজেপির জয়নগর ৩ নম্বর মণ্ডল সভাপতি শংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘‘মোটরভ্যান ও টোটোকে এইভাবে স্বীকৃতি পৌরসভা কীভাবে দিচ্ছে, সেটা পৌর আধিকারিক বলতে পারবেন।তবে বর্তমান সরকারের নিয়ম মেনেই পৌরসভাকে চলা উচিত।’’এদিকে রাজ্যে পালাবদলের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় রয়েছে। সম্প্রতি রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী অর্জুন সিংয়ের বক্তব্যেও টোটো নিয়ে কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত মিলেছে।রাজ্য ও জাতীয় সড়কে টোটো চলাচল করতে পারবে না এবং নিয়ম ভাঙলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।পাশাপাশি মোটরভ্যানেরও কোনও সরকারি বৈধতা নেই বলেই দাবি সংশ্লিষ্ট মহলের। ফলে সরকারি ভাবে বৈধতা না থাকা যানবাহনের কাছ থেকে পৌরসভা কীসের ভিত্তিতে টাকা নিচ্ছে, তা নিয়েই তৈরি হয়েছে মূল প্রশ্ন।অন্যদিকে, জয়নগর মজিলপুর পৌর এলাকায় টোটো ও মোটর ভ্যানের সংখ্যা বাড়তে থাকায় যানজটও ক্রমশ বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলিতে অনিয়ন্ত্রিত টোটো চলাচলের কারণে নিত্যদিন সমস্যায় পড়ছেন পথচারী ও অন্যান্য যানবাহনের চালকেরা। অভিযোগ রয়েছে, পুরনো মোটরভ্যানগুলি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়ার কারণে পরিবেশ দূষণও বাড়ছে।পৌরসভার অবশ্য বক্তব্য, এই টাকা কোনও নতুন ব্যবস্থা নয়। জয়নগর মজিলপুর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যান রথীন কুমার মণ্ডল বলেন, ‘‘বহু বছর ধরেই প্রতিবছর পুজোর আগে এই টাকা তোলা হয়। পৌরসভা এলাকায় চলাচলের উপর এটি ট্যাক্স হিসেবে নেওয়া হয়। পৌরসভা চালাতে গেলে নিজস্ব কিছু তহবিল প্রয়োজন। সেই তহবিল থেকেই পৌর কর্মচারীদের পুজোর বোনাস-সহ বিভিন্ন খরচ মেটানো হয়।’’টোটো নিয়ে সরকারি বিধিনিষেধ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, রাজ্য সড়কে টোটো চলাচলের উপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ডের রাস্তা দিয়ে তারা চলাচল করতে পারবে। সেই কারণেই পৌর এলাকার উপর চলাচলের জন্য ট্যাক্স নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাঁর।তবে টোটো ও মোটর ভ্যানের আইনি বৈধতা ঠিক কতটা এবং পৌরসভার দেওয়া টোকেন আদৌ কোনও সরকারি চলাচলের অনুমতি কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর এড়িয়ে গিয়েছেন ভাইস চেয়ারম্যান। যানজট নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি পুলিশের ও ট্রাফিক বিভাগের দায়িত্ব বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।ফলে একদিকে সরকারি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা যানবাহন, অন্যদিকে পৌরসভার তরফে টাকা নিয়ে টোকেন ও রসিদ প্রদান—দুইয়ের মধ্যে আইনি সম্পর্কটি ঠিক কী, তা নিয়েই ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। পৌরসভার নিজস্ব তহবিল বাড়ানোর যুক্তি থাকলেও, সেই টাকা আদায়ের আইনি ভিত্তি এবং দেওয়া টোকেনের বৈধতা স্পষ্ট না হলে ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা আরও বড় প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে বলেই মনে করছেন শহরের বাসিন্দাদের একাংশ।