আবদুল ওদুদ: বাংলা, বিহার ও ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারি এখন চরম অবহেলা ও অনাদরে পড়ে রয়েছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হাজারদুয়ারির চারপাশ এখন আগাছায় ভরে গেছে, যার ফলে সেখানে সাপের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একারণে প্রাণভয়ে পর্যটক থেকে শুরু করে স্থানীয় সাধারণ মানুষ কেউই হাজারদুয়ারি কিংবা ইমামবাড়ার দিকে পা বাড়াতে সাহস পাচ্ছেন না। আগে মাঝেমধ্যে রাতের অন্ধকারে সাপের দেখা মিললেও, বর্তমানে দিনের আলোতেই চন্দ্রবোড়া, গহম ও খরিশের মতো বিষধর সাপের আনাগোনা বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি এখন বিষধর সাপের আস্তানায় পরিণত হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

করোনা মহামারীর প্রেক্ষাপটে মুর্শিদাবাদের এই ঐতিহাসিক হাজারদুয়ারি এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এই পরিস্থিতির জন্য লালবাগ টাউন তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি ইন্দ্রজিৎ ধর সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারকে দায়ী করেছেন।

তিনি জানান, হাজারদুয়ারি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে তিনটি আলাদা বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে গার্ডেন বা হর্টিকালচার বিভাগ, দ্বিতীয়টি মিউজিয়াম বিভাগ এবং তৃতীয়টি সার্কেল বিভাগ। সার্কেল বিভাগের মূল কাজ হলো ভবনের কাঠামোগত রক্ষণাবেক্ষণ করা, মিউজিয়াম বিভাগের দায়িত্ব হলো ঐতিহাসিক সামগ্রীগুলো সাজিয়ে রাখা ও সেগুলোর সুরক্ষা দেওয়া, আর গার্ডেন বিভাগের কাজ হলো বাগানের নতুন গাছ লাগানো ও নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার রাখা। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি অত্যন্ত হতাশাজনক। ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকেই হাজারদুয়ারির চারপাশ এবং ফাঁকা মাঠ আগাছায় পরিপূর্ণ হয়ে রয়েছে। গত ১৫ মাস ধরে এই জঙ্গল পরিষ্কার না করায় সাপের উপদ্রব বহুগুণ বেড়ে গেছে বলে তিনি দাবি করেন।

ইন্দ্রজিৎবাবুর আরও অভিযোগ, গার্ডেন বা হর্টিকালচার বিভাগের অফিসটি পশ্চিমবঙ্গে নয়, বরং ওড়িশায় অবস্থিত।

ডেপুটি সুপারিন্টেনডেন্টের অফিস ওড়িশায় থাকায় কোনো কর্মকর্তা এখন আর এখানে আসেন না। লকডাউনের দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কাউকে দেখা না মেলায় প্রশাসনিক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে আগাছা পরিষ্কারের দাবি জানিয়ে ডেপুটেশন দেওয়ার মতো কোনো দায়িত্বশীল ব্যক্তিকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তালাবন্দি এই হাজারদুয়ারি বর্তমানে সাপের অবাধ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

তৃণমূলের টাউন সভাপতির অভিযোগের তালিকায় আরও রয়েছে টেন্ডার সংক্রান্ত জটিলতা। তিনি জানান, ২০০৩ সালের দিক থেকেই গার্ডেন সংক্রান্ত টেন্ডার নিয়ে নানা সমস্যা শুরু হয়। ২০০৫-০৬ সালের দিকে গার্ডেন কর্মীরা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হলে আদালত সেই মামলাটি খারিজ করে দেয়।

সেই সময় টেন্ডার পাওয়া ঠিকাদাররা নিজেদের ইচ্ছেমতো কর্মী নিয়োগ করে কাজ করাতেন, যার ফলে মাস্টার রোলের মাধ্যমে হাজারদুয়ারি চত্বর অনেক বেশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকত। বর্তমানে গার্ডেন বিভাগের টেন্ডারের দায়িত্ব দিল্লির একটি সংস্থার কাছে থাকলেও, নতুন করে কোনো টেন্ডার না হওয়ায় চত্বরটি চরম অবহেলায় পড়ে রয়েছে।

তৃণমূল কংগ্রেসের টাউন সভাপতির মতে, বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকার যে নিয়মে টেন্ডার আহ্বান করছে, তাতে ঠিকাদাররা কোনো লাভের মুখ দেখতে পাচ্ছেন না। ফলে কেউ আর নতুন করে টেন্ডার জমা দিতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এখন টেন্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে একর প্রতি কিংবা স্কোয়ার ফুটের হিসাবের জটিলতা রয়েছে। এছাড়া নাইট গার্ড নিয়োগ, গাছে জল দেওয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক বিষয়ও যুক্ত রয়েছে। এর পরেও কর্মীদের ইএসআই ও পিএফ সংক্রান্ত নানা সমস্যা লেগেই থাকে। যার কারণে ঠিকাদাররা হাজারদুয়ারির মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব নিতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। হাজারদুয়ারি নিউ প্যালেসের দায়িত্বপ্রাপ্ত সুপারিন্টেনডেন্ট গৌতম হালদারকে এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।