ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় ত্রুটি শনাক্ত করতে কোন সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছিল, তা জানাতে অস্বীকার করল নির্বাচন কমিশন। তথ্য জানার অধিকার (আরটিআই) আইনে করা আবেদনের জবাবে কমিশন জানিয়েছে, এই তথ্য বাণিজ্যিক গোপনীয়তা ও মেধাস্বত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে তা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে কমিশনের দাবি, এসআইআরের কাজের জন্য আলাদা করে কোনও নতুন সফটওয়্যার তৈরি করা হয়নি।

‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেলঙ্গানার করিমনগরের সমাজকর্মী এমএ মুজিব আয়ুব আরটিআই আইনে আবেদন করে জানতে চেয়েছিলেন, ভোটার তালিকার ভুল ও অসঙ্গতি শনাক্ত করতে কোন সফটওয়্যার, অ্যাপ্লিকেশন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ত্রুটি শনাক্ত করতে পারে কি না, সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিজে থেকেই ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয় কি না এবং এই প্রক্রিয়ায় কারা পর্যালোচনা করেন, সেই প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি।

গত ১৬ অক্টোবর ওই আবেদনের জবাব দেয় নির্বাচন কমিশন।

কমিশন জানায়, এসআইআরের জন্য নতুন কোনও সফটওয়্যার তৈরি করা হয়নি। ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী এলাকার ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ইআরও)। নথি ও তথ্যের ভিত্তিতেই তাঁরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কমিশনের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের দায়িত্ব ইআরওর।

সফটওয়্যার সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে কমিশন আরটিআই আইনের ৮(১)(ডি) ধারা উল্লেখ করেছে। এই ধারায় বাণিজ্যিক গোপনীয়তা, ট্রেড সিক্রেট এবং মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশে ছাড় রয়েছে, যদি তা প্রকাশের ফলে তৃতীয় পক্ষের বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এআই, মেশিন লার্নিং এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুল শনাক্ত করার প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নগুলিরও সরাসরি উত্তর দেয়নি কমিশন।

তাদের যুক্তি, এ ধরনের প্রশ্ন মূলত ব্যাখ্যা চাওয়ার সমতুল। আরটিআই আইনের ২(এফ) ধারা অনুযায়ী, এ ধরনের ব্যাখ্যা চাওয়াকে তথ্যের সংজ্ঞার মধ্যে ধরা যায় না।

ভোটারদের তথ্য ও তালিকার ত্রুটি কারা পর্যালোচনা করেছিলেন, সেই প্রশ্নের উত্তরে কমিশন আরটিআই আইনের ৮(১)(জি) ধারার উল্লেখ করেছে। এই ধারায় কারও জীবন বা শারীরিক নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশে ছাড় দেওয়া যায়। পাশাপাশি, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ১৩বি(১) ও ১৩বি(২) ধারা উল্লেখ করে কমিশন জানিয়েছে, ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট এলাকার ইআরওর।

এদিকে, নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির বিষয়টি সামনে আসার পর এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ২৫ সেপ্টেম্বরের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সাঁধু ও বিবেক জোশী ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের আগস্টের মধ্যে অন্তত ১৪ বার কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিয়ে লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন।

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া, নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভোটারদের তথ্যসংক্রান্ত সফটওয়্যারে প্রবেশাধিকার নিয়েও তাঁদের আপত্তি ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এই খবর প্রকাশ্যে আসার পর মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সরব হয় বিরোধী দলগুলি। তাঁর বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবিতে সুপ্রিম কোর্টেও রিট আবেদন জমা পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ায় লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। সম্প্রতি রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক তথা প্রাক্তন সাংসদ জহর সরকার এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছেন। দু’দফায় যাচাইয়ের পর বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের মাধ্যমে যাঁরা ভোটার তালিকায় নাম ফেরানোর ছাড়পত্র পেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের নাম বাদ দেওয়ার জন্য কমিশন কোন নিয়মে আবেদন করেছিল, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

এসআইআর নিয়ে একের পর এক বিতর্কের আবহে এবার আরটিআই আবেদনের জবাবে সফটওয়্যারের তথ্য প্রকাশে কমিশনের অস্বীকৃতি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।