মিরাজুল ইসলাম: ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে চলা এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হাওড়ার পাঁচলা এলাকার বাসিন্দা শেখ ফরিদুল ইসলাম দেশের রাষ্ট্রপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে একটি বিশদ চিঠি পাঠিয়ে নিজের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। সেই চিঠিতেই তিনি চরম হতাশা প্রকাশ করে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি চাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন, যা ঘিরে ইতিমধ্যেই ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।

চিঠিতে ফরিদুল ইসলাম দাবি করেছেন, তাঁর পূর্বপুরুষরা বহু প্রজন্ম ধরে ভারতের বাসিন্দা এবং তিনি নিজেও একজন বৈধ ভারতীয় নাগরিক। তা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশনের এসআইআর প্রক্রিয়ায় তাঁর নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত অপমান হিসেবেই দেখছেন না, বরং এটি বৃহত্তর গণতান্ত্রিক অধিকারের লঙ্ঘন বলেও দাবি করেছেন।

তাঁর বক্তব্য,  তিনি-সহ প্রায় ৯১ লক্ষ মানুষ এই প্রক্রিয়ায় ভোটাধিকার হারিয়েছেন, যা সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী।

ফরিদুল তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেছেন, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যেসব নথি জমা দিতে বলা হচ্ছে, তা দেশের প্রান্তিক ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের পক্ষে সংগ্রহ করা অত্যন্ত কঠিন। অনেকের কাছেই জন্ম শংসাপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র বা পুরনো সরকারি নথি নেই। বিশেষত গ্রামীণ ও দরিদ্র পরিবারের মানুষদের মধ্যে জন্মনিবন্ধনের অভাব এখনও একটি বাস্তব সমস্যা। ফলে প্রকৃত নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও বহু মানুষ শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় নথির অভাবে তালিকা থেকে বাদ পড়ছেন বলে তাঁর অভিযোগ। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু মুসলিম, দলিত ও আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের উপর এই প্রক্রিয়ার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ছে।

ফরিদুলের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনের যাচাই প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের ছাপ স্পষ্ট এবং বেছে বেছে প্রান্তিক মানুষের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, অতীতে নির্বাচন কমিশনের নথিভুক্তিকরণ প্রক্রিয়ায় ভুল-ত্রুটি থাকায় অনেকের নামের বানান বা তথ্যের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে, যার দায় এখন সাধারণ মানুষের উপর চাপানো হচ্ছে।নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর মতে, এসআইআর প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি স্পষ্ট নয় এবং বারবার নিয়ম পরিবর্তনের ফলে স্বচ্ছতা নষ্ট হয়েছে। এটি প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতির কাছে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছেন তিনি, যাতে এই প্রক্রিয়া বাতিল করে সকলের ভোটাধিকার পুনর্বহাল করা হয়।

চিঠির শেষাংশে ফরিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, একজন সুস্থ নাগরিক হয়েও ভোটাধিকার হারানোর অপমান তিনি সহ্য করতে পারছেন না। তাই তিনি বাধ্য হয়ে স্বেচ্ছামৃত্যুর অনুমতি প্রার্থনা করেছেন এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে এর সমাধান চেয়েছেন।এই ঘটনায় এখনও পর্যন্ত প্রশাসনিকভাবে কোনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। তবে বিষয়টি রাজনৈতিক মহল ও নাগরিক সমাজে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে স্বচ্ছতা, মানবিকতা এবং অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর আস্থা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে এখন রাজ্য জুড়ে নজর রয়েছে।