পুবের কলম ওয়েবডেস্কঃ  টানা দেড় দশক রাজ্যের শীর্ষ পদে আসীন থাকা সত্ত্বেও মুখ্যমন্ত্রীর এই সাদামাটা জীবনযাপন ও সম্পত্তির খতিয়ান রাজনৈতিক মহলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ফের চর্চার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আধুনিক রাজনীতিতে যখন জনপ্রতিনিধিদের বিপুল সম্পত্তির খতিয়ান বা ফুলে-ফেঁপে ওঠা ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স প্রায়শই খবরের শিরোনামে উঠে আসে, সেখানে পশ্চিমবঙ্গের টানা তিন বারের মুখ্যমন্ত্রীর এই হলফনামা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী। পরনে চিরপরিচিত সুতির শাড়ি এবং পায়ে হাওয়াই চটি— এই বেশেই তিনি গত ১৫ বছর ধরে নবান্ন থেকে গোটা রাজ্য পরিচালনা করছেন। সম্প্রতি ভবানীপুর কেন্দ্রের তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিতে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের কাছে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে হলফনামা পেশ করেছেন, তাতে তাঁর এই অনাড়ম্বর জীবনেরই আনুষ্ঠানিক প্রমাণ মিলল।

‘বাংলার নিজের মেয়ে’ বা ভবানীপুরের ‘ঘরের মেয়ে’ হিসেবে তাঁর যে রাজনৈতিক পরিচিতি, তার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্য রেখেই জমা দেওয়া নথিতে উঠে এসেছে তাঁর আর্থিক স্থিতাবস্থার বিস্তারিত চিত্র। হলফনামায় তিনি আয়ের একটি স্বচ্ছ রূপরেখা তুলে ধরেছেন। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে তাঁর মোট আয় হয়েছে ২৩ লক্ষ ২১ হাজার ৫৭০ টাকা। ঠিক তার আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে তাঁর আয়ের পরিমাণ ছিল ২০ লক্ষ ৭২ হাজার ৭৪০ টাকা।

বিগত কয়েক বছরের হিসাব পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবর্ষে তাঁর আয় হয়েছিল ৩৮ লক্ষ ১৪ হাজার ৪১০ টাকা এবং ২০২০-২১ অর্থবর্ষে আয়ের পরিমাণ ছিল ১৫ লক্ষ ৪৭ হাজার ৮৪৫ টাকা। সাধারণত নিজের লেখা বইয়ের রয়্যালটি এবং আঁকা ছবি থেকেই এই আয় হয়ে থাকে বলে বিভিন্ন সময়ে তৃণমূল শিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

নগদ অর্থ এবং ব্যাঙ্ক জমার ক্ষেত্রেও পাই-টু-পাই হিসাব দিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী। বর্তমানে তাঁর হাতে নগদ অর্থের পরিমাণ অত্যন্ত সামান্য— মাত্র ৭৫ হাজার ৭০০ টাকা। ব্যাঙ্কের সঞ্চয়ের ক্ষেত্রে, ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কে তাঁর একটি সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যেখানে গচ্ছিত রয়েছে ১২ লক্ষ ৩৬ হাজার ২০৯ টাকা ৭১ পয়সা। পাশাপাশি, আসন্ন নির্বাচনের যাবতীয় খরচ সামলানোর জন্য ওই একই ব্যাঙ্কের অন্য একটি অ্যাকাউন্টে রাখা আছে আরও ৪০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, ব্যাঙ্কে তাঁর মোট গচ্ছিত অর্থের পরিমাণ ১২ লক্ষ ৭৬ হাজার ২০৯ টাকা ৭১ পয়সা। এর সঙ্গে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের আয়কর রিটার্ন (টিডিএস) বাবদ তিনি ৪০ হাজার ৬০০ টাকা ফেরত পেয়েছেন।

গয়নার প্রতি তাঁর কোনও কালেই আসক্তি নেই, হলফনামাতেও তার প্রমাণ মিলেছে। তাঁর কাছে মাত্র ৯ গ্রাম ৭৫০ মিলিগ্রাম সোনার গয়না রয়েছে, বর্তমান বাজারে যার আনুমানিক মূল্য ১ লক্ষ ৪৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে, তাঁর মোট অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৫ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫০৯ টাকা ৭১ পয়সায়।

স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে হলফনামার তথ্য আরও বেশি চমকপ্রদ। গোটা বাংলায় বা দেশের কোথাও মুখ্যমন্ত্রীর নিজস্ব কোনও জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ি নেই। তিনি নিজে যে বাড়িতে থাকেন, কালীঘাটের সেই সুপরিচিত টালির চাল দেওয়া পুরনো বাড়িটিও তাঁর নিজের নামে নয়। অথচ এই বাড়িতেই দেশের তাবড় তাবড় রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে বিশিষ্টজনেরা বহুবার আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। নিজের নামে কোনও কৃষিজমি বা অকৃষিজমিও নেই তাঁর।

যাতায়াতের জন্য নিজস্ব কোনও চারচাকার গাড়িও তিনি কেনেননি। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, তাঁর ঘাড়ে এক টাকারও ব্যাঙ্ক ঋণ বা অন্য কোনও আর্থিক দায়বদ্ধতা নেই।

সম্পত্তির পাশাপাশি নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং আইনি রেকর্ডও নির্বাচন কমিশনকে জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হলফনামা অনুযায়ী, ১৯৭৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) ডিগ্রি লাভ করেন, যার চূড়ান্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৭৯ সালে। এরপর ১৯৮২ সালে তিনি শহরের ঐতিহ্যবাহী যোগেশ চন্দ্র চৌধুরী ল কলেজ থেকে আইন নিয়ে স্নাতক বা এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অসংখ্য সরকার বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিলেও, বর্তমানে তাঁর বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি মামলা প্রলম্বিত নেই এবং তিনি কখনও কোনও মামলায় দণ্ডিত হননি বলেও হলফনামায় স্পষ্ট করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে, বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর এই নির্বাচনী হলফনামা তাঁর রাজনৈতিক দর্শনেরই এক অনবদ্য দলিল। ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির শীর্ষে বসেও যে মোহমুক্ত এবং সাধারণ মানুষের মতো জীবনযাপন করা যায়, এই হলফনামা যেন তারই প্রমাণ। আর তাই, ভোটের উত্তপ্ত আবহেও যাবতীয় রাজনৈতিক তরজার ঊর্ধ্বে উঠে তাঁর এই সাদামাটা জীবনযাপন ও সম্পত্তির হিসাবই চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ড্রয়িংরুমের সান্ধ্য-আড্ডার অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।