শিশুরা আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিশেষ নিয়ামত। তাদের প্রতি ভালোবাসা, স্নেহ, মমতা ও সুন্দর আচরণ করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং ইসলামেরও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তিনি তাদের আদর করতেন, চুম্বন করতেন, তাদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলতেন এবং তাদের অনুভূতি ও আবেগের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর জীবনাচরণে শিশুদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।

১. শিশুদের প্রতি দয়া ও ভালোবাসা প্রদর্শন:

একবার মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নাতি হজরত হাসান (রা.)-কে চুম্বন করছিলেন। সেখানে উপস্থিত আকরা ইবনে হাবিস (রা.) বললেন, আমার দশটি সন্তান রয়েছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকেই কখনও চুম্বন করিনি।

তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন—مَنْ لَا يَرْحَمُ لَا يُرْحَمُ

অর্থ: "যে দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হয় না।"

—সহিহ বুখারি, হাদিস ৫৯৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩১৮।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, সন্তানদের আদর করা, স্নেহ করা এবং তাদের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. শিশুদের কষ্টের কথা চিন্তা করে নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন:

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের প্রতি এতটাই সহানুভূতিশীল ছিলেন যে, নামাজের মধ্যেও তাঁদের কষ্টের কথা বিবেচনা করতেন।

তিনি বলেছেন, কখনও দীর্ঘ নামাজ পড়ার ইচ্ছা নিয়ে নামাজ শুরু করি। কিন্তু কোনও শিশুর কান্না শুনতে পেলে নামাজ সংক্ষিপ্ত করে দিই।

কারণ, আমি জানি, শিশুর কান্না শুনে তার মায়ের কষ্ট হয়।

—সহিহ বুখারি, হাদিস ৭০৭।

এ ঘটনা প্রমাণ করে, শিশুদের অনুভূতি এবং তাদের মায়ের মানসিক অবস্থার প্রতিও নবীজি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

৩. শিশুদের সঙ্গে কোমল ও সুন্দর আচরণ:

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনও শিশুদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করতেন না। তাদের প্রতি স্নেহশীল ছিলেন এবং ভালোবাসা প্রকাশ করতেন। শিশুদের সঙ্গে তাঁর আচরণে ছিল কোমলতা, ধৈর্য ও আন্তরিকতা।

তিনি শুধু বড়দের সম্মান করতেই শেখাননি, ছোটদের প্রতিও দয়া প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর শিক্ষা ছিল- সমাজে প্রত্যেকের সঙ্গে মর্যাদা ও ভালোবাসার আচরণ করতে হবে।

৪. শিশুদের সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলা ও সালাম বিনিময়:

হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার কয়েকজন শিশুর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তাদের সালাম দিলেন।

—সহিহ বুখারি, হাদিস ৬২৪৭।

এখান থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, শিশুদের ছোট করে দেখা উচিত নয়। তাদেরও সম্মান দিতে হবে, ভালোবাসতে হবে এবং সুন্দর ব্যবহার করতে হবে।

৫. শিশুদের সঙ্গে ধৈর্যশীল আচরণের শিক্ষা:

হজরত আনাস (রা.) বলেন, আমি দশ বছর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খেদমত করেছি। তিনি কখনও আমাকে 'উফ' পর্যন্ত বলেননি। কোনও কাজ করে ফেললে বলেননি, কেন করলে? আর কোনও কাজ না করলে বলেননি, কেন করলে না?

—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩০৯।

এই ঘটনা শিশুদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। তাদের ভুল হলে অপমান না করে ধৈর্যের সঙ্গে বুঝিয়ে বলা উচিত।

পবিত্র কোরআনে সন্তানদের বিষয়ে কী শিক্ষা দেওয়া হয়েছে?

১. সন্তানদের সুন্দরভাবে গড়ে তোলার শিক্ষা:

পবিত্র কোরআনে হজরত লোকমান (আ.)-এর উপদেশের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি তাঁর সন্তানকে শিরক থেকে বিরত থাকতে, নামাজ প্রতিষ্ঠা করতে, সৎকাজের নির্দেশ দিতে এবং ধৈর্য ধারণ করতে উপদেশ দিয়েছিলেন।

সূরা লোকমান, আয়াত ১৩ ও ১৭।

২. সন্তানদের চোখের শীতলতা হিসেবে পাওয়ার দোয়া:

আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মুমিনদের একটি সুন্দর দোয়া শিখিয়েছেন—

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا

অর্থ: "হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করুন এবং আমাদের মুত্তাকিদের নেতা বানান।

"

—সূরা আল-ফুরকান, আয়াত ৭৪।

৩. সন্তানদের জীবন ও নিরাপত্তার অধিকার:

আল্লাহ তাআলা বলেন—

"তোমরা দারিদ্র্যের ভয়ে তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না। আমিই তাদের রিজিক দিই এবং তোমাদেরও।"

—সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩১।

এই আয়াত শিশুদের জীবন রক্ষা এবং তাদের প্রতি দায়িত্বশীল হওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে।

আমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয়:

মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবন থেকে স্পষ্ট শিক্ষা পাওয়া যায়, শিশুদের মানুষ করতে হলে শুধু শাসন করলেই হবে না; তাদের ভালোবাসতে হবে, সময় দিতে হবে, কথা শুনতে হবে এবং ভুল করলে ধৈর্যের সঙ্গে সংশোধন করতে হবে।

শিশুরা বড়দের আচরণ দেখেই অনেক কিছু শেখে। তাই তাদের সামনে সুন্দর ব্যবহার, সত্যবাদিতা, সহানুভূতি ও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা জরুরি।

মনে রাখতে হবে, শিশুদের প্রতি ভালোবাসা কোনও দুর্বলতা নয়; বরং এটি নবীজির সুন্নাহ এবং সুন্দর সমাজ গঠনের অন্যতম ভিত্তি।

আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের ভয় দেখিয়ে নয়, ভালোবাসা ও সুন্দর আদর্শের মাধ্যমে মানুষ করে তুলি। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথেই গড়ে উঠুক আগামী প্রজন্ম।

আল্লাহ আমাদের সন্তানদের নেককার, আদর্শবান ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী হিসেবে গড়ে তোলার তৌফিক দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র: পবিত্র কোরআন—সূরা লোকমান ১৩, ১৭; সূরা আল-ফুরকান ৭৪; সূরা আল-ইসরা ৩১। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমের উল্লেখিত হাদিসসমূহ।