আবুল খায়েরঃ বাংলার ভোটার তালিকা সংশোধনীর নামে মুসলিমদের টার্গেট করা হয়েছে বলে সরব হলেন বিশিষ্টরা। রবিবার পশ্চিমবঙ্গ এডুকেশনিস্ট ফোরাম-এর উদ্যোগে কলকাতা প্রেস ক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক যোগেন্দ্র যাদব, রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ডঃ পরকাল প্রভাকর, ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক অখিল স্বামী। আয়োজক সংস্থার তরফে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন উপচার্য তথা যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওম প্রকাশ মিশ্র, চেয়ারম্যান দেবনারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ অনান্যরা। 

মানুষের সঙ্গে বেইমানি করেছে নির্বাচন কমিশন। মুসলমানদের নাম বাদের জন্য টার্গেট করেই লজিক্যাল ডিসক্রেপেনসির অ্যালগিরিদম বানানো হয়েছে বলে তোপ দাগেন আইনজীবী প্রশান্ত প্রশান্ত ভূষণ। তিনি বলেন, বাংলায় মুসলিম ভোটারের সংখ্যা প্রায় ২৭ শতাংশ। অন্যদিকে লজিক্যাল ডিসক্রেপেনসির মাধ্যমে যে ২৭ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার তিন ভাগের দু’ভাগই মুসলমান। বিজেপির লক্ষ্য হিন্দু রাষ্ট্র বানানো। তাই এদের ভোটারধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে ওদের পুরো লক্ষ্য এখনও শেষ হয় নি।

একইসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এসআইআর-এর নাম করে যেভাবে ভোটার তালিকার সংশোধন করা হচ্ছে। ভারতের অতীতে কোনও দিন এইভাবে তালিকা সংশোধন করা হয় নি। প্রশান্ত ভূষণ আরও বলেন, জনপ্রতিনিধি আইনের নিয়ম অনুযায়ী ইনটেনসিভ রিভিশন বাড়ি বাড়ি গিয়ে করতে হবে। সেখানে নির্বাচন কমিশনের প্রতিনিধি সরাসরি ভোটারের সঙ্গে কথা বলে খোঁজ নিয়ে সংযোজন বিয়োজন বা সংশোধন করবে। আর এই কাজের জন্য কমপক্ষে ছ’মাস সময় দিতে হবে। পাশাপাশি তিনি বলেন, সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশন বিজেপির শাখা সংগঠনের মত কাজ করছে। ন্যাচেরাল জাস্টিসকে পদদলিত করে বেআইনিভাবে ভোটাধিকার হরণ করছে। দুঃখের কথা এই যে, তা দেখেও সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর প্রক্রিয়া চলতে দিচ্ছে। আমরা আশা করবো আগামীকাল সুপ্রিম কোর্ট ন্যায়ের পক্ষেই মত দেবে।  

অপ্রতিরোধ্য বিজেপিকে বেগ দিয়েছে বাংলা ৷ আর তাই বাংলায় বিশেষ এসআইআর করে বিজেপি বিরোধী ভোটারদের নাম কাটার চেষ্টা চলছে ৷ এমনটাই মনে করেন যোগেন্দ্র যাদব ৷ তাঁর মতে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন যা করছে সেটাকে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন না-বলে স্পেশাল ইম্পেডিমেন্ট রিমুভাল বলা উচিত ৷ ‘ইম্পেডিমেন্ট’ শধটির আভিধানিক অর্থ বাধা বা প্রতিবন্ধকতা দূর করা ৷ তিনি বলেন, দেশজুড়ে ‘অশ্বমেধ যজ্ঞ’ শুরু করেছে বিজেপি ৷ তাদের একমাত্র লক্ষ্য সব রাজ্যে বিজেপির সরকার তৈরি করা ৷ সেখানেই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে বাংলা ৷ আর তাই শাসক দলের ভোট কেটে জয়ের রাস্তা সুগম করতে চাইছে বিজেপি।

এসআইআর প্রক্রিয়ার দু’টি রূপ আছে বলে ব্যাখ্যা করেন যোগেন্দ্র যাদব৷ একটি হল সাধারণ এসআইআর৷ অন্যটি বিশেষ৷ সাধারণ এসআইআর দেশের সর্বত্র হচ্ছে ৷ তাতে প্রাথমিক তালিকায় নাম কাটা যাচ্ছে ৷ কিন্তু বাংলার প্রক্রিয়া বেশ জটিল বলে দাবি করেন যোগেন্দ্র ৷ বিজেপির লক্ষ্য পূরণের জন্য একমাত্র বাংলাতেই প্রায় ১০ হাজার মাইক্রো অবজারভার নিয়োগ করেছিল নির্বাচন কমিশন। অনান্য রাজ্যের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণে রোল অবজারভার, স্পেশাল অবজারভার নিয়োগ করা হয়েছে। যার সংখ্যা প্রায় ৩০। অতিরিক্ত তালিকাতে ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বাংলায় খসড়া তালিকায় ৬৩ লক্ষ নাম বাদ গিয়েছিল ৷ এক এক করে মোট ১২টি অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পর দেখা যায় মোট ৯০ লক্ষেরও বেশি নাম বাদ গিয়েছে। যোগেন্দ্রকে ভাবাচ্ছে এই অতিরিক্ত ২৭ লক্ষ নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি৷ তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে, পয়েন্ট তুলে তুলে দাবি করেন ভোটারের লজিক্যাল ডিসক্রেপেনসির জেরে নাম বাতিল করছে নির্বাচন কমিশন। কিন্তু তারা নিজেরাই একের পর এক ডিসক্রেপেনসি করেছে। সরকারি জন্ম মৃত্যুর হিসাব অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা অন্য বিজেপি শাসিত রাজ্যের ভোটার তালিকার চেয়ে অনেক নিখুঁত। তিনি বলেন, মাত্র ৩৫ দিনে জুডিশিয়াল অফিসাররা ৬০ লক্ষের বেশি বিচারাধীনের মামলা নিষ্পত্তি করেছে। অর্থাৎ এক দিনে প্রায় ২৫টির বেশি মামলার নিষ্পত্তি করেছে।
ভোটাধিকারের মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এত দ্রুত সমাধান কী সত্যিই সম্ভব প্রশ্ন তোলেন তিনি। নমুনা হিসাবে সাংবাদিক সম্মেলনে চারটি ফাইল দেখান তিনি। যেখানে কলকাতার বিভিন্ন বিধানসভা কেন্দ্রের চার জন মুসলিম নাগরিকের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে দু’জনের নামের বানান ভুল। সেখানে দেখা যাচ্ছে একজনের সেখ নামে এসকে লেখা হয়েছে পরবর্তীতে এসএআইকেএইচ আছে। অন্যজনের ক্ষেত্রে আগের নামের বানানের সঙ্গে পরের নামের বানানে একটি স্পেস বেশি পড়ে গেছে। বাকি দুই ক্ষেত্রে ভোটারের দাদুর সঙ্গে তার বয়সের পার্থক্য সঠিক বলে মনে হয়নি জুডিশিয়াল অফিসারদের। অথচ প্রতিটি ক্ষেত্রেই পাসপোর্ট, প্যান কার্ড, জন্ম সার্টিফিকেটের মত নথি জমা দিয়েছেন। যোগেন্দ্র যাদব বলেন, দেশের সব আইনকে পাশ কাটিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য সুপ্রিমকোর্ট সব কিছু করতে পারে। তাই আশা করবো শীর্ষ আদালত সমস্ত দিকে বিবেচনা করে যোগ্যদের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেবে। পরকাল প্রভাকর এবং অখিল স্বামীও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকার সমালোচনা করেন।