দুই দশকেরও বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির পর ইরাক থেকে নিজেদের অবশিষ্ট ঘাঁটিগুলো থেকে পুরোপুরি সরে গেল মার্কিন বাহিনী। ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই এই প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে যে দীর্ঘ সামরিক উপস্থিতির সূচনা হয়েছিল, এই প্রত্যাহারের মাধ্যমে তার অবসান ঘটল। ওয়াশিংটন ও বাগদাদের মধ্যে ২০২৪ সালে প্রত্যাহারের সময়সূচি নিয়ে চুক্তি হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে বাস্তবায়িত হয়েছে।
আরও পড়ুন:
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরান এবং ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি নিজেদের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছে। তাদের দাবি, ইরাক থেকে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সরিয়ে নেওয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব কমার ইঙ্গিত।
অন্যদিকে, ইরাকের কয়েকজন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনীর চলে যাওয়ার ফলে ইরানে ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির প্রভাব আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গিগোষ্ঠীও নিরাপত্তার ফাঁককে কাজে লাগানোর সুযোগ পেতে পারে।আরও পড়ুন:
দীর্ঘ সময় ধরে ইরাক ছিল ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এক জটিল ভারসাম্যের ক্ষেত্র। ইরাকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনই দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় ইরানেরও উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী ইরাকের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে এসব গোষ্ঠীর হামলা এবং তার পাল্টা মার্কিন হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
আরও পড়ুন:
২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডের কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলেইমানি নিহত হওয়ার পর দুই দেশের উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।
এরপর ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে মার্কিন বাহিনীর সংঘাতও একাধিকবার সামনে এসেছে।আরও পড়ুন:
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাকে দুই দশকের বেশি সময়ের মার্কিন সামরিক অভিযানে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। মার্কিন বাহিনী ইরাকি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ ও গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ফলে তাদের প্রত্যাহারের পর সেই নিরাপত্তা সক্ষমতা কতটা কার্যকরভাবে বজায় রাখা যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আরও পড়ুন:
ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলির কাছে অবশ্য এই প্রত্যাহারের রাজনৈতিক তাৎপর্য আলাদা। তাদের বক্তব্য, ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর সরে যাওয়া দীর্ঘদিনের ‘প্রতিরোধ’-এর সাফল্য। তেহরানও মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে স্বাগত জানিয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের একাধিক সদস্য এর আগে জানিয়েছিলেন, মার্কিন সেনা ইরাক ও অঞ্চল থেকে সরে গেলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে পারে।আরও পড়ুন:
তবে ইরাকের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ দেশের নিরাপত্তা কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা। বিশেষজ্ঞদের একাংশের আশঙ্কা, মার্কিন সেনা ও তাদের গোয়েন্দা নজরদারি ব্যবস্থা সরে যাওয়ার পর ইসলামিক স্টেটের সক্রিয়তা ফের বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াগুলির প্রভাব নিয়ন্ত্রণ করাও বাগদাদ সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইরাক এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করল। একদিকে বিদেশি সামরিক উপস্থিতি কমে দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে নতুন বার্তা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে নিরাপত্তার ভার পুরোপুরি ইরাকি বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার ফলে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা। আর এই পরিবর্তনকে ইরান ও তার মিত্ররা মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছে।