পুবের কলম ওয়েব ডেস্কঃ ভোটের আবহে পশ্চিমবঙ্গের জন্য নিজেদের নির্বাচনী রূপরেখা প্রকাশ করল বিজেপি। শুক্রবার রাজ্যে এসে সেই সংকল্পপত্র প্রকাশ করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। দলের দাবি, প্রায় ১০ হাজার মানুষের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতেই এই ঘোষণাপত্র তৈরি হয়েছে। সংকল্পপত্র প্রকাশের সময় অমিত শাহ বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ‘বিকশিত ভারত’ ভাবনারই প্রতিফলন এই ঘোষণাপত্র। তাঁর কথায়, নারী, কৃষক, শ্রমিক থেকে শুরু করে সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্যই এতে নানা পরিকল্পনা রয়েছে, যা মানুষের আশা বাড়াবে এবং হতাশা দূর করবে। একই সঙ্গে তিনি তৃণমূল সরকারের সমালোচনা করে দাবি করেন, গত ১৫ বছরে সিন্ডিকেট, গুন্ডারাজ এবং অনুপ্রবেশের কারণে বাংলার মানুষ দুর্ভোগের মধ্যে ছিলেন। বিজেপির সংকল্পপত্র সেই পরিস্থিতি বদলে নতুন আস্থা ও সম্ভাবনার বার্তা দিচ্ছে।

‘বিকশিত বাংলা’ গড়ার ডাক দিয়ে শাহ বলেন, বিজেপি ইতিমধ্যেই রাজ্যের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটি চার্জশিট প্রকাশ করেছে, যেখানে বিগত বছরগুলোর নানা অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। তিনি জানান, বাংলা নববর্ষ থেকে শুরু হবে দলের ‘সংকল্প যাত্রা’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তীর সময়ের মধ্যেই মানুষ ভয়ের রাজনীতি থেকে মুক্তি পাবে বলে তাঁর দাবি। বিজেপি ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরে রাজ্যের উন্নয়নের নতুন পথ খুলে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অনুপ্রবেশের প্রশ্নেও কড়া অবস্থানের কথা পুনরায় উল্লেখ করেন অমিত শাহ।

তাঁর দাবি, অবাধ অনুপ্রবেশ চলতে থাকলে ভবিষ্যতে রাজ্যের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। বিজেপি ক্ষমতায় এলে ‘অনুপ্রবেশমুক্ত বাংলা’ গড়ে তোলার আশ্বাস দেন তিনি।

বিজেপির সংকল্পপত্রে উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি

ঘোষণাপত্রে রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রের উন্নয়নের কথা তুলে ধরা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পরিকল্পনা হল—

জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করতে অনুপ্রবেশ রোধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকার গঠনের ৪৫ দিনের মধ্যে সপ্তম পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সরকারি কর্মীদের বেতন কার্যকর করা হবে। 

নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মহিলাদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।

সরকারি কর্মী ও পেনশনভোগীদের বকেয়া ডিএ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি।

কেন্দ্রীয় প্রকল্প যেমন আয়ুষ্মান ভারতের সুবিধা রাজ্যের মানুষকে দেওয়া হবে।

মহিলাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষ উদ্যোগ।

সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে ইউনিফর্ম সিভিল কোড কার্যকর করার পরিকল্পনা।

স্টার্টআপ ও ক্ষুদ্র শিল্পে জোর দিয়ে যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি।

বেকার যুবকদের প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা ভাতা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য মাসে ১৫ হাজার টাকা সহায়তা।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে শ্বেতপত্র প্রকাশ এবং দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা।

কয়লা, বালি ও গরু পাচার রোধে কঠোর পদক্ষেপ।

ভোট-পরবর্তী হিংসায় আক্রান্তদের আইনি সহায়তা দিতে বিশেষ উদ্যোগ।

মহিলাদের নিরাপত্তায় ‘দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড’ গঠন।

ধান, আলু ও আমচাষিদের কাছ থেকে সরাসরি ফসল কিনবে সরকার এবং সহায়ক মূল্য বাড়ানো হবে।

চা বাগান শ্রমিকদের উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা এবং দার্জিলিংয়ের চা বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে বোর্ড গঠন।

উত্তরবঙ্গে নতুন এইমস, ক্যানসার হাসপাতাল, আইআইটি ও ফ্যাশন ডিজাইনিং ইনস্টিটিউট তৈরির পরিকল্পনা।

কুড়মালি ও রাজবংশী ভাষাকে অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ।

কলকাতা মেট্রোর সম্প্রসারণ এবং পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়ন।

বন্ধ হয়ে যাওয়া জুটমিল পুনরায় চালু ও আধুনিক পাট শিল্প গড়ে তোলা।

কুলপি ও তাজপুরে গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ।

সরকারি চাকরিতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণ এবং সরকারি বাসে বিনা ভাড়ায় যাতায়াতের সুবিধা।

অন্তঃসত্ত্বা মহিলাদের এককালীন ২১ হাজার টাকা সহায়তা।

সিঙ্গুরে শিল্প পার্ক গঠন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রসার।

পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য।

কৃষকদের জন্য কোল্ড স্টোরেজ বাড়ানো এবং ব্লকভিত্তিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা।

জঙ্গলমহলে আধুনিক সরকারি হাসপাতাল গড়ে তোলা।

দুধ উৎপাদন বাড়ানো এবং মৎস্যজীবীদের কেন্দ্রীয় প্রকল্পের আওতায় আনা।

শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিশেষ স্কলারশিপ।

বাংলার সংস্কৃতি বিকাশে নতুন প্রতিষ্ঠান এবং আধুনিক থিয়েটার কেন্দ্র গঠন।

দার্জিলিংকে হেরিটেজ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে উন্নত করা এবং সুন্দরবনের রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারকে ঘিরে পর্যটন বাড়ানো।

শেষে অমিত শাহ রাজ্যের ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, অতীতে বামফ্রন্ট ও তৃণমূল—দুই সরকারকেই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এবার বাংলার উন্নয়নের জন্য বিজেপিকে একবার সুযোগ দেওয়ার আবেদন জানান তিনি। তাঁর কথায়, ‘সোনার বাংলা’ গড়ার লক্ষ্যে রাজ্যের সব শ্রেণির মানুষকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায় বিজেপি।