রাজ্যের কয়েকটি জেলায় নাবালিকা বিবাহ, টিন-এজ প্রেগন্যান্সি এবং একের পর এক সন্তানের জন্মের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল স্বাস্থ্য দপ্তর। বিশেষ করে মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তরবঙ্গের কিছু এলাকা এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের কয়েকটি ব্লকে এই প্রবণতা স্বাস্থ্য-সূচকের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।

সোমবার নতুন সরকারের ১০০ দিনের কাজের খতিয়ান তুলে ধরতে গিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, একটি দম্পতির দু’টির বেশি সন্তান হওয়া কাম্য নয়। তবে দু’য়ের বেশি সন্তান নিয়ন্ত্রণে সরকার কোনও নতুন আইন আনছে কি না, নাকি এটি শুধুই সচেতনতার আহ্বান—সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট করে কিছু জানাননি।

মন্ত্রী বলেন, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, উত্তরবঙ্গের কিছু অংশ এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের কয়েকটি এলাকায় নাবালিকা বিবাহ, অল্প বয়সে গর্ভধারণ এবং বহু সন্তানের জন্ম দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে। সূতি ও শামসেরগঞ্জের মতো ব্লকগুলিতেও বিষয়টি যথেষ্ট উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রসূতি মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করতে গিয়ে স্বাস্থ্য দপ্তর এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার পুলিশ সুপারদের সঙ্গেও আলোচনা করা হচ্ছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

১০০ দিনের ২৩ দফা সাফল্য তুলে ধরার সময় স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও পরিষেবা সম্প্রসারণের একাধিক পরিকল্পনার কথাও জানান শারদ্বত মুখোপাধ্যায়।

প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কমিউনিটি হেলথ সেন্টার এবং জেলা হাসপাতালগুলিতে অ্যালোপ্যাথির পাশাপাশি আয়ুষ পরিষেবা চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই ‘কো-লোকেশন’ ব্যবস্থায় রোগীরা একই জায়গায় অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুযোগ পাবেন। এর জন্য ৪৮৪ জন আয়ুষ মেডিক্যাল অফিসার নিয়োগ করা হবে।

রাজ্যে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালুর কথাও জানিয়েছেন মন্ত্রী। তাঁর দাবি, এই প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১.৪৩ কোটি পরিবার অর্থাৎ প্রায় ৫.৯৭ কোটি মানুষ পরিষেবা পাবেন।

প্রায় ১,৯৩০টি হাসপাতালকে প্রকল্পের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনায় আরও ৮০ লক্ষ মানুষকে যুক্ত করা হবে।

রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো আরও শক্তিশালী করতে আলিপুরদুয়ার, সিউড়ি, শিলিগুড়ি, আসানসোল এবং কালিম্পংয়ে পাঁচটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে। কলকাতাতেও একটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাবি, সরকারের ১০০ দিনে রাজ্যে ৯৭৫টি এমবিবিএস আসন বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে ৪৭৫টি আসন সরকারি ক্ষেত্রে।

সরকারি হাসপাতালে বেডের সংকটের কারণে রোগী ভর্তি নিয়ে সমস্যা কমাতে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যেই এই ব্যবস্থায় বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে ২,৪২৬টি বেডের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা যাচাই করতে সোমবার এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে যাদবপুরের একটি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে রোগী স্থানান্তরের মক ড্রিল করা হয়। আগামী দিনে অন্যান্য মেডিক্যাল কলেজেও একই ধরনের মহড়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

এছাড়াও সরকারি হাসপাতালে রোগীদের খাবারের বরাদ্দ ৫৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১০ টাকা করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার ইন্টিগ্রেটেড কন্ট্রোল রুম, ২০০টি ১০২ অ্যাম্বুল্যান্স এবং ৩১০টি মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট চালুর পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়েছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ২০০টি মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট কাজ করছে।

জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে কিশোরীদের এইচপিভি টিকাকরণ, টিবি-মুক্ত ভারত কর্মসূচি এবং স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিধি বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছে সরকার।

এছাড়া রাজ্যে ৪৫৮টি জনঔষধি কেন্দ্র ও ১০০টি অমৃত ফার্মেসি চালু এবং ব্লকস্তরে রক্ত পরীক্ষা, এক্স-রে ও আলট্রাসোনোগ্রাফি পরিষেবা আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

স্বাস্থ্য দপ্তরের দাবি, একদিকে যেমন চিকিৎসা পরিকাঠামো বাড়ানোর উদ্যোগ চলছে, তেমনই নাবালিকা বিবাহ, অল্প বয়সে মাতৃত্ব এবং বহু সন্তানের জন্মের মতো সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যাগুলির মোকাবিলাতেও জোর দেওয়া হচ্ছে।